আল্লাহর গুণাবলী ও নামসমূহের জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব 1

আল্লাহর গুণাবলী ও নামসমূহের জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব  1

তৃতীয়ত: নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে আল্লাহর পরিচয় লাভ করুন:

{আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর, যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।} [সূরা: আল-আ’রাফ, আয়াত: ১৮০]

আল্লাহ তা'আলা বলেন: {আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর, যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।}
[সূরা: আল-আ’রাফ, আয়াত: ১৮০]

১- {আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম সমূহ}, এর অর্থ।

মহান প্রভুর সব নামই প্রশংসামূলক, আল্লাহ তা'আলা এর সবগুলিকেই সুন্দরতম ও চমৎকার বলে বর্ণনা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে: {আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর, যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।}
[সূরা: আল-আ’রাফ, আয়াত: ১৮০।]

আল্লাহর নামসমূহ শুধুমাত্র শব্দগতভাবেই সুন্দর নয়। বরং সেগুলো পরিপূর্ণ গুণাবলীর প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। সুতরাং তাঁর সকল নামই হচ্ছে প্রশংসামূলক, মহিমাপ্রকাশক ও মর্যাদাপ্রকাশক। একারণেই সেগুলোকে বলা হয়েছে সুন্দর। আল্লাহর সকল গুণাবলীই হচ্ছে পরিপূর্ণ গুণাবলী। সকল স্তুতিই হচ্ছে মহিমামূলক। তাঁর সকল কাজই প্রজ্ঞাপূর্ণ, করুণানির্ভর, কল্যাণকর ও ন্যয়নিষ্ঠ।

ঈমানের একটি অংশ হচ্ছে আল্লাহর সকল নাম ও গুণাবলীর প্রতি বিশ্বাস রাখা। আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ হাদীসের আলোকে আল্লাহর নাম ও গুনাবলীর প্রতি ঈমানের দুটি ভিত্তি রয়েছে।

প্রথম মূলনীতি:

কোন প্রকার বিকৃতি, সংকোচন, সাদৃশ্য কিংবা সমকক্ষ স্থাপন ব্যতিরেকে আল্লাহর মহত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও বর্ণিত সকল নাম আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: {কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তিনি সব শুনেন, সব দেখেন।}[সূরা: আশ-শুরা, আয়াত: ১১]

দ্বিতীয় মূলনীতি:

সে সকল নামের অর্থ বুঝা এবং সেগুলোর মর্ম যেসব গুণাবলীকে শামিল করে সেগুলোকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা। তবে কোন অবস্থাতেই আল্লাহর সেসব গুন ও বৈশিষ্ট্যের ধরণ নিয়ে কোন ব্যখ্যায় পতিত না হওয়া। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {তিনি জানেন যা কিছু তাদের সামনে ও পশ্চাতে আছে এবং তারা তাকে জ্ঞান দ্বারা আয়ত্ত করতে পারে না।}[সূরা: ত্বহা, আয়াত: ১১০।]

আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর সুন্দর নামসমূহ ও সুউচ্চ গুণাবলীর সাথে পরিচিতি করার উদ্দেশ্যও বর্ণনা করেছেন। আর সে উদ্দেশ্য হলো: এগুলোর মাধ্যমে তাঁর ইবাদাত করা। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:{বলুন: আল্লাহ বলে আহবান কর কিংবা রহমান বলে, যে নামেই আহবান কর না কেন, সব সুন্দর নাম তাঁরই।} [সূরা: আল-ইসরা, আয়াত: ১১০।]

আল্লাহ তা'আলা বলেন: {আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর, যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।}[সূরা: আল-আ’রাফ, আয়াত: ১৮০]

২- {সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক} এর উদ্দেশ্য:

আল্লাহর সুন্দর নামগুলোর মাধ্যমে তাঁকে ডাকার দু'টি দিক আছে। কোন কিছু চাওয়ার আবেদনে আল্লাহকে ডাকা, যেমন: হে আল্লাহ! আমাকে দান করুন। হে রহিম! আমাকে রহমত করুন। হে কারীম! আমাকে সম্মানিত করুন। দ্বিতীয়ত: কোন চাওয়া সম্বলিত দু'আ ছাড়াই নিছক প্রশংসা ও ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সেসব নামে তাঁকে আহবান করা। যেমন: আল্লাহর গুনবাচক নাম সমূহের মাধ্যমে তাঁর মহিমা বর্ণনা করা। আর সুন্দর গুন ও নামের অধিকারী মহান আল্লাহর মহীমাকীর্তন একাধারে যবান ও অন্তর উভয়টি দ্বারায়ই হতে পারে।

৩- {আর তাদেরকে বর্জন কর, যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে} এর উদ্দেশ্য:

আল্লাহর নামের অস্বীকৃতি: কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর কোন গুনবাচক বিষয়কে অস্বীকার করা, অথবা আল্লাহর কোন গুনকে তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনা করা, কিংবা তাঁর গুণ বা নামের সাথে এমন অসামঞ্জস্য বিষয় যুক্ত ও ব্যখ্যা করা- যার অস্তিত্ব কুরআন-সুন্নাহর কোথাও নেই।


আল্লাহর গুণাবলী ও নামসমূহের জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব:

নিম্নে আল্লাহর মহত্ত্ব, মর্যাদা, গুণাবলী ও নামসমূহ সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব প্রদত্ত হলো:

প্রথমত:

আল্লাহর সত্তা ও তাঁর অতিসুন্দর নামসমূহ ও মহান গুণাবলী সংক্রান্ত জ্ঞানই সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান। মানুষ এ সম্পর্কে তার সাধ্যমতো জ্ঞান অর্জন করবে।

আর আল্লাহর গুণাবলী ও নামসমূহ সম্পর্কে বান্দার ধারণা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই বান্দার বন্দেগী ও আল্লাহর প্রতি ভালবাসা নির্ণয় হবে, যা তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও জান্নাত লাভের মাধ্যমে সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিবে। আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছা আল্লাহর তাওফীক ব্যতীত অসম্ভব।

দ্বিতীয়ত:

আল্লাহর গুণাবলী ও নামসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনই হচ্ছে মৌলিক জ্ঞান, ঈমানের ভিত্তি ও প্রথম ফরয। মানুষ তার রবকে যথাযথভাবে জানতে ও চিনতে পারলেই কেবল তাঁর যথার্থ ইবাদাত করতে পারবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {জেনে রাখুন, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই।}
[সূরা: মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৯।]

তৃতীয়ত:

আল্লাহর গুণাবলী ও তাঁর নামসমূহের সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে ঈমান ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। একত্ববাদে দৃঢ়তা আসে। ইবাদাতের স্বাদ অনুভূত হয়। আর এটাই হচ্ছে ইবাদাতের প্রাণ, মূল ও উদ্দেশ্য। মহিমান্বিত ও পবিত্র নামের অধিকারী মহান আল্লাহ যখন তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর সত্তা সম্পর্কিত জ্ঞানের কারণে কাউকে সম্মানিত করতে চান, তখন তিনি তাঁর মহৎ গুণাবলী উপলব্ধি করার নিমিত্তে বান্দার অন্তর খুলে দেন, এবং সে ওহীর আলো থেকে সেগুলো অর্জন করতে সক্ষম হয়। ফলে অহির আলোকে কোন বিষয় প্রতিভাত হলে সে তা যথার্থভাবে গ্রহণ করে নেয়। সন্তষ্টচিত্তে মেনে নেয় এবং দৃঢ় বিশ্বাসে নত হয়ে যায়। ফলে ওহীর আলোয় তার অন্তর আলোকিত হয়ে যায়।

যেকোন জ্ঞানের মর্যাদা নির্ণয় হয় তার বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে। আর বলা বাহুল্য, আল্লাহর গুণাবলী ও নামসমূহ সম্পর্কিত জ্ঞানের চেয়ে আর কোন মহৎ জ্ঞান নেই। কারণ, আল্লাহর চেয়ে শ্রেষ্ঠ আলোচ্য বিষয় আর কি হতে পারে?

ও মুখাপেক্ষী। মানুষের রূহ ও আত্মা তার সৃষ্টিকর্তার পরিচয় লাভ এবং তার স্মরণ ও মুহাব্বতের চেয়ে অন্য কোন কিছুর প্রতি বেশি মুখাপেক্ষী নয়। আর এটি অর্জন হবে তখনই যখন বান্দা আল্লাহর গুন ও বৈশিষ্ট্যের ইলম হাসিল করবে। সুতরাং বান্দা আল্লাহর গুন-বৈশিষ্ট্যের জ্ঞান যতো বেশি অর্জন করে, আল্লাহকে ততো বেশি চিনতে পারে, তাঁর প্রতি ততো বেশি আকৃষ্ট হয় এবং তাঁর নিকটবর্তী হয়। আর যতো বেশি এ বিষয়টিকে এড়িয়ে থাকে, আল্লাহ সম্পর্কে ততো বেশি অজ্ঞ থাকে, আল্লাহ তার নিকট ততো বেশি অপছন্দনীয় হয় এবং তার থেকে দূরে অবস্থান করে। বান্দা স্বীয় অন্তরে আল্লাহর অবস্থান যেমন রাখে, আল্লাহও তার প্রতি সে ধরণের অবস্থান গ্রহণ করে থাকেন।

আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন অন্তরের পরিশুদ্ধি ও ঈমানের পরিপূর্ণতার কারণ:

চতুর্থত:

আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে যে ব্যক্তি বাস্তবিক জ্ঞান রাখেন, তিনি আল্লাহর নাম ও গুণাবলী থেকে যা জ্ঞান অর্জন করেছেন তা দিয়ে আল্লাহর মর্যাদা ও তিনি যেসব বিধি-বিধান তথা শরিয়ত দিয়েছেন, তার যথার্থতা উপলব্ধি করেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নাম ও সিফাতের দাবির বিপরীতে কোন কিছু করেন না। তাঁর সকল কাজ ন্যায়-নিষ্ঠা, অনুগ্রহ ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ। তিনি তাঁর প্রশংসা, প্রজ্ঞা, অনুগ্রহ ও ন্যায়পরায়ণতার দাবির বিপরীত কোন বিধান জারি করেন না। তাঁর সকল নির্দেশ সত্য ও সঠিক। তাঁর সকল আদেশ-নিষেধ ন্যায়সম্মত, প্রজ্ঞা ও দয়ায় পরিপূর্ণ।

পঞ্চম:

আল্লাহর গুণাবলীর সঙ্গে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ইবাদাত সমূহের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ আল্লাহর সকল গুণাবলীরই আনুষাঙ্গিক ইবাদাত রয়েছে। উক্ত গুনটি সে ইবাদাতকে আবশ্যক করে। বান্দার অন্তর ও বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা সম্পাদিত সব ইবাদাতই আল্লাহর কোন না কোন সিফাত সংশ্লিষ্ট। সুতরাং বান্দা যখন আল্লাহর সিফাত- ক্ষতি করা, উপকার করা, দান করা, নিষেধ করা, সৃষ্টি করা, রিযিক দেয়া, জীবিত করা, মৃত্যু দেওয়া- এগুলোকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত বলে জানে- তখন তার মধ্যে তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর প্রতি ভরসার ইবাদাত সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে বান্দা যখন আল্লাহর সিফাত: সর্বদ্রষ্টা ও সর্বশ্রোতা হওয়া, তাঁর কাছে বিন্দু পরিমাণ বস্তুও অপ্রকাশ্য না থাকা, সকল গুপ্ত বিষয়াদী জানা, মানুষের চোখের খেয়ানত এবং অন্তরে থাকা গুপ্ত বিষয়ে অবগত থাকা-ইত্যাদিকে বিশ্বাস করে, তখন এর ফলে স্বীয় বাকশক্তি, অন্যান্য বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অন্তরকে অন্যায় থেকে মুক্ত রাখার ইবাদাত করে থাকে। আর এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার আল্লাহর সন্তষ্টির উপর ভিত্তি করে করলে বান্দার মধ্যে লজ্জার গুণ সৃষ্টি হয়। আর লজ্জা তাকে হারাম ও অন্যায় কাজ থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করে। এমনিভাবে আল্লাহর স্বয়ংসমৃদ্ধতা, তাঁর মহত্ত্ব, সম্মান, পবিত্রতা, ইহসান ও রহমত সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে বান্দার আশার ব্যপ্তি বৃদ্ধি পায়। আল্লাহর মহত্ত্ব ও সম্মান সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে আল্লাহর প্রতি অনুনয় ও মুহাব্বত অর্জিত হয়। আর অন্তরের উল্লেখিত গুপ্ত অবস্থাসমূহ বান্দাকে প্রকাশ্য অনেক ইবাদাত করতে সহায়তা করে। সুতরাং এই সব ইবাদাতই হচ্ছে আল্লাহর নামসমূহ ও সিফাতের চাহিদা ও দাবি।

ষষ্ঠ:

অন্তর প্রশান্তকরণ, চরিত্র ও আচরণ সংশোধনের ক্ষেত্রে আল্লাহর নাম ও সিফাতসমূহের অনেক ভূমিকা রয়েছে। একইভাবে সেগুলো সম্পর্কে কোন ভাবনা ও ধারণা না থাকলে আত্মাব্যধির দুয়ার খুলে যায়।

সপ্তম:

আল্লাহর নাম ও সিফাতসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করলে কর্মে ও বিপদাপদে বান্দা শান্তনা পায়। বান্দা যখন জানবে যে, তার প্রভু মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময় ও ন্যায়পরায়ণ; তখন সে কাউকে জুলুম করবে না। বরং যেকোন পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট থাকবে ও ধৈর্য ধরবে। আর কোন সমস্যায় পতিত হলে মনে করে যে, এর মধ্যে নিশ্চই কোন কল্যান ও উপকারিতা নিহিত আছে, যা হয়তো সে আবিস্কার করতে পারছে না। কিন্তু অবশ্যই উক্ত বিষয়টি আল্লাহর প্রজ্ঞা ও ইলমের অধিনে রয়েছে। এই মানসিকতা পোষণের সাথে সাথেই সে প্রশান্ত হয়ে যায়, আল্লাহর প্রতি তার আস্থা বেড়ে যায় এবং তার সকল বিষয় আল্লাহর নিকট সোপর্দ করে।

অষ্টম:

আল্লাহর গুণাবলী ও নামের মর্মসমূহ উপলব্ধির ফলে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর মহত্ত্ব, তাঁর প্রতি আশা ও ভয় এবং তাঁর উপর ভরসা ও তাঁর সর্বদ্রষ্টা হওয়ার চেতনাবোধ সৃষ্টি হয়।

নবম:

নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলার নাম ও সিফাতসমূহের অর্থ উপলব্ধির মাধ্যমে খুব সহজে আল্লাহর কিতাব উপলব্ধি করা যায়। আল্লাহ তা'আলা নিম্ন বর্ণিত আয়াতে কুরআন উপলব্ধি করার জন্য আমাদেরকে নির্দেশ করেছেন: {এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি বরকত হিসেবে অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ লক্ষ্য করে এবং বুদ্ধিমানগণ যেন তা অনুধাবন করে।}[সূরা: সোয়াদ, আয়াত: ২৯]

কুরআনে যেহেতু অধিক পরিমানে আল্লাহর নাম ও সিফাতের উল্লেখ রয়েছে, সুতরাং সেগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করলে প্রকারান্তরে কুরআন নিয়েই চিন্তাভাবনা করা হয়। আর যখন আপনি কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করবেন, তখন আপনি ভূমণ্ডলের উর্ধে আল্লাহর আরশে এক মহা রাজত্বের সন্ধান পাবেন। যিনি বান্দার সকল বিষয় পরিচালনা করেন, আদেশ-নিষেধ করেন, রাসূল প্রেরণ করেন, কিতাব নাযিল করেন, সন্তুষ্ট হন, অসন্তষ্ট হন, শান্তি দেন, দান করেন, অপমানিত করেন, উচ্চ মর্যাদায় আসীন করেন, অর্ধনমিত করেন, দেখেন, শুনেন, গোপন-প্রকাশ্য সব জানেন, যা ইচ্ছা তাই করেন। সকল পরিপূর্ণতার বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, সকল দোষ থেকে মুক্ত, তাঁর আদেশ ব্যতীত কোন কিছু এক বিন্দুও নড়ে না। তাঁর জ্ঞানের বাইরে একটি পাতাও পড়ে না। তিনি মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।

যে আল্লাহকে পেলো তার হারানোর কি আছে? আর যে আল্লাহকে হারালো সে কি পেল?

দশম:

আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কিত জ্ঞান মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি শিষ্টাচার ও লজ্জা সৃষ্টি করে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার সাথে শিষ্টাচারের অর্থ হলো, তাঁর মনোনীত ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে ভদ্রতা অবলম্বন করা। তিনটি জিনিস ব্যতীত কেউ কখনো আল্লাহর সাথে আদব ও শিষ্টাচার অর্জন করতে পারবে না। এক. আল্লাহর নাম ও গুণাবলীসমূহের ইলম হাসিল করা। দুই. তাঁর মনোনীত ধর্ম, শরীয়ত ও তিনি যা পছন্দ ও অপছন্দ করেন সে সম্পর্কিত ইলম হাসিল করা। তিন. সত্যকে গ্রহণ ও সত্য প্রতিপালনে প্রস্তুত বিনম্র একটি আত্মার অধিকারী হওয়া।

একাদশ:

আল্লাহর গুণাবলী ও নামসমূহের জ্ঞানার্জনের দ্বারা বান্দা নিজের সীমাবদ্ধতা, দোষ-ত্রুটি এবং অবস্থান উপলব্ধি করতে পারে।

চারটি মন্দ স্বভাবের ভিত্তিতে মানুষ সত্য অস্বীকার করে থাকে। অহংকার, ক্রোধ, হিংসা ও কু-প্রবৃত্তি। আর এ চারটি মন্দ স্বভাবের মূলভিত্তি হলো নিজের ও প্রতিপালকের পরিচয় সম্পর্কে অজ্ঞতা। কেননা বান্দা যদি তার রবের পরিপূর্ণ গুণাবলী ও মহিমান্বিত বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং নিজের সীমাবদ্ধতা ও ক্ষণস্থায়িত্বের কথা জানতে পারে তাহলে সে কখনো অহংকারী এবং নিজের কোন বিষয় নিয়ে ক্রোধান্বিত হবে না এবং কারো উপর আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের কারণে সে হিংসা করবে না।

দ্বাদশ:

আল্লাহ তা'আলার গুণাবলী ও নামসমূহের ব্যাপারে বান্দার অজ্ঞতা ও অস্পষ্টতা এবং সেসব গুনের ব্যাপারে আল্লাহ প্রদত্ত ব্যখ্যায় সন্তষ্ট না থাকা ভ্রষ্টতার অন্যতম কারণ। সুতরাং যে আল্লাহকে চিনতে পারেনি সে আসলে কিছুই চিনতে পারে নি, এবং যে এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারে নি, সে কোন বাস্তবতাই উপলব্ধি করতে পারে নি। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সত্তার জ্ঞান, তাঁর সন্তষ্টির পথে চলা, ও আল্লাহ পর্যন্ত পৌছার উপায় সমূহ জানা থেকে বঞ্চিত থাকলো, সে যেন কোন জ্ঞান ও কল্যানের পথই মাড়ায় নি। মানুষের প্রকৃত বেঁচে থাকা নির্ভর করে তার রূহ ও কলবের বেঁচে থাকার উপর। আর অন্তরের প্রাণ হলো তার সৃষ্টিকর্তার পরিচয় লাভ করা, তাঁর ভালবাসা লালন করা, একমাত্র তারই ইবাদাত করা, তাঁর প্রতি ধাবিত হওয়া ও তাঁর স্মরণে প্রশান্তি অনুভব করা এবং তাঁর নৈকট্যপ্রিয় হওয়া। যে ব্যক্তি এই জীবন পেল না সে যেন সমগ্র কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। পার্থিব কোন প্রাপ্তিও তার উক্ত ক্ষতি পোষাতে পারবে না।

ত্রয়োদশ:

আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা একত্ববাদকে খালেছ করা ও ঈমানকে পরিপূর্ণ করার উপায়। এর মাধ্যমে অন্তরের ভাল আমল সমূহ প্রকাশ পায়। যেমন: এখলাস, আল্লাহর ভালোবাসা, আশা, ভয় ও তাওয়াক্কুল ইত্যাদি। এই বিষয়ে মানুষ খুব কমই যত্নবান হয়ে থাকে এবং চিন্তাভাবনা করে থাকে, অথচ অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষার জন্য এটা অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে ব্যক্তি শরীয়তের উৎস ও সূত্রসমূহ সম্পর্কে ধারণা রাখে, তার কাছে এটা স্পষ্ট যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কর্মসমূহ অন্তরের কর্মসমূহের সাথে সম্পৃক্ত, এবং অন্তরের বিশুদ্ধতা ব্যতীত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিশুদ্ধ পথে পরিচালিত হবে না। বরং বান্দার বহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল সমূহের চেয়ে অন্তরের আমলসমূহ অধিক পালনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ। একজন ঈমানদার একজন মুনাফেক থেকে স্বতন্ত্র হয়ে যান মূলত উভয়ের অন্তরের আমলের উপর ভিত্তি করে। আর বহ্যিক অঙ্গের আমলের পূর্বেই অন্তরের আমল ব্যতিরেকে কারো ইসলামে প্রবেশও কল্পনাতীত। শারীরিক বা দৈহিক ইবাদাতের তুলনায় আত্মিক ইবাদাত অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ। অন্তরের আমলের পরিমানও বেশী এবং স্থায়ী। অন্তর হলো শারীরিক ইবাদাতের পথ। যার কারণে আত্মিক ইবাদাত সর্বদা আবশ্যক, কোন অবস্থাতেই এক্ষেত্রে ছাড় নেই।

মানবজাতির আত্মিক ও শারীরিক শুদ্ধতার মাধ্যম হলো আল্লাহর পরিচয় লাভ করা।

আল্লাহর নাম ও গুণাবলী অনুধাবনের ক্ষেত্রে কিছু জ্ঞাতব্য ও লক্ষণীয় বিষয়:

আল্লাহ তা'আলা বলেন: {কোন কিছুই তাঁর মত নয়। এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।} [সূরা: আশ-শুরা, আয়াত: ১১]

১- নিশ্চয় আল্লাহর সমস্ত নামই অতীব সুন্দর। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম।}[সূরা: আরাফ, আয়াত: ১৮০।]

আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাঁর সমুন্নত সত্তার পরিচয় দান করেছেন, যেন আমরা তাঁর ইবাদাত করি, সাথে সাথে তাঁকে ভয় করি, ভালোবাসি ও তাঁর নিকট মুক্তি প্রার্থনা করি।

২- আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত হবে দুটি সূত্রে, তৃতীয় কোন সূত্রের মাধ্যমে নয়। তাহলো আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সুন্নাত। সুতরাং এ দুটি ব্যতীত অন্য কিছুর মাধ্যমে তাঁর নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত হবে না। সুতরাং আমরা আল্লাহর জন্য সেসব বিষয়সমূহ সাব্যস্ত করবো যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাব্যস্ত করেছেন, এবং তাহারা যা নিষিদ্ধ করেছেন আমরাও তা নিষিদ্ধ জ্ঞান করবো। আর যে বিষয়ে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত কিংবা খন্ডন কোনটিই বর্ণিত হয়নি এরকম শব্দের ব্যপারে নিরবতা অবলম্বন করবো। এমন বিষয়ে শব্দগতভাবে কোন কিছু গ্রহণও হবে না বর্জনও হবে না। তবে অর্থের ক্ষেত্রে তা বিশ্লেষণযোগ্য। অতএব আল্লাহর সত্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোন অর্থ হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে। আর যদি এমন কোন অর্থ হয় যা আল্লাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় তাহলে তা প্রত্যাখান করা ওয়াজিব।

৩- আল্লাহ তা'আলার গুণাবলীর ব্যাপারে মন্তব্য করা তাঁর সত্তার ব্যাপারে মন্তব্য করার নামান্তর। সুতরাং আমরা আল্লাহ তা'আলার সত্তার প্রকৃত অবস্থা যেমন সবিস্তারিত জানি না, তাঁর সুন্দর গুণাবলীর বিস্তারিত ব্যখ্যাও ও ধরণও আমাদের অজানা। তাই এ সকল বিষয় আমরা কোন রকম পরিবর্তন পরিবর্ধন ও দৃষ্টান্ত ও উপমা স্থাপন ছাড়াই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবো ও মেনে নেব।

৪- আল্লাহর গুণাবলী ও নামসমূহের অনেক বাস্তবিক অর্থ রয়েছে, রূপক অর্থ নয়। আর সেসব গুনবাচক নাম আল্লাহর সত্তা ও তাঁর সত্তার মধ্যে থাকা অনাদী গুনাবলীকে প্রমাণ করে। যেমন: “আল-কাদির” “আল-আলিম”“আল-হাকীম” “আল-সামি” “আল-বাছির”। নিশ্চয় এসব মহিমান্বিত নামসমূহ আল্লাহ তা'আলার পবিত্র সত্তার জন্য উপরোক্ত গুন-বৈশিষ্ট্যকে প্রমাণ করে।

৫- নিশ্চয় সমস্ত ত্রুটি থেকে আল্লাহর মুক্ত থাকার বিষয়টি চিরন্তন। সবধরণের ত্রুটি থেকে আল্লাহর মুক্ত থাকার বিষয়টি সংক্ষিপ্ত ও মৌলিকভাবে বিশ্বাস করতে হবে আর ইতিবাচক গুনসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত ব্যখ্যা সাপেক্ষে বিশ্বাস করতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:{কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তিনি সব শুনেন, সব দেখেন।}
[সূরা: আশ-শুরা, আয়াত: ১১]

৬- আল্লাহর নামসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা: আল্লাহর গুনবাচক নামের প্রতি বিশ্বাস যেমন জরুরী, তাঁর নামের সূত্রমূলকে বিশ্বাস করাও তেমনই জরুরী। যেমন আল্লাহর নাম 'রহীম' প্রমাণ করে যে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলার মধ্যে 'রহমত' গুণ রয়েছে। অতএব তিনি তার রহমতের বারি দ্বারা তার বান্দাদেরকে সিঞ্চিত করেন।

আল্লাহ তা'আলার নামসমূহ অনুধাবনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ কিছু বিষয় লক্ষণীয়। তা হচ্ছে:

১- নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলার নামসমূহ নির্দিষ্ট সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে: «আমি প্রার্থনা করছি আপনার পবিত্র ঐ সকল নাম দ্বারা যা আপনি নিজের জন্য নির্বাচন করেছেন, অথবা আপনার কোন সৃষ্টিকে শিখিয়েছেন, অথবা আপনার কিতাবে নাযিল করেছেন, অথবা যা অদৃশ্যের জ্ঞান হিসাবে নিজের কাছে সংরক্ষিত রেখেছেন।» (-আহমদ।)

২- নিশ্চয় আল্লাহর নাম সমূহের কিছু আছে এমন যে, সেগুলোকে আমরা কেবল আল্লাহর জন্যই সাব্যস্ত করবো, সেগুলো হলো ঐসব নাম, যা তিনি শুধুমাত্র নিজের জন্য নির্ধারন করেছেন এবং তার মধ্যে অন্য কাউকে অংশীদার করেননি। আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারও বেলায় তা প্রয়োগ করাও জায়েয হবে না। যেমন “আল্লাহ” “আর-রহমান” আর তাঁর কিছু নাম আছে যা অন্যদের জন্য ব্যবহার করা যায়। যদিও আল্লাহর নাম ও গুণাবলীসমূহ পরিপূর্ণ ও পূর্ণতর। অন্যদের বেলায় ব্যবহার হলে সে অর্থ কোনভাবেই প্রকাশ করবে না।

৩- আল্লাহর নামসমূহই তাঁর গুণাবলীর উৎস। সুতরাং প্রত্যেক নাম সিফাতকে সাব্যস্ত করে। তবে সিফাত থেকে কোন নাম উৎসারিত হয় না। যেমন আমরা বলে থাকি আল্লাহ তা'আলা ক্রোধান্বিত হন। এই গুনটি থেকে কোন নাম আমরা সৃষ্টি ও আবিস্কার করে বলি না যে তিনি 'গাজুব' বা মহাক্রোধের অধিকারী।




Tags: