আল্লাহর মুহাব্বত বা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা 1

আল্লাহর মুহাব্বত বা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা 1

১- মুহাব্বত:

আল্লাহর প্রেমের তাৎপর্য-

আল্লাহর ভালবাসা:

আল্লাহর প্রতি ভালবাসার অর্থ হলো অন্তরে তাঁর প্রতি ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হওয়া ও ধাবিত হওয়া, এবং আল্লাহর চাওয়া ও নির্দেশিত বিষয়ের ব্যপারে ইতিবাচক সাড়া দেয়া। আর সর্বোপরি অন্তর জুড়ে আল্লাহর স্মরণ বিরাজমান ও প্রভাব বিস্তার করে থাকা।

আল্লাহর মুহাব্বতের হাকীকত

আল্লাহকে মুহাব্বত করা মানে আল্লাহর ইবাদাতকে ও তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রতি অনুরক্ত হওয়া। আল্লাহর নির্দেশ পালন ও নিষিদ্ধ বিষয়াবলী পরিহারই মূলত আল্লাহকে ভালবাসা ও তাঁকে প্রেমপূর্ণ শ্রদ্ধা নিবেদনের নামান্তর। আর এই আন্তরিক ভালবাসাই হলো তাওহীদের আলামত ও প্রভাব। এর মাধ্যমেই অগণিত মর্যাদা ও ফযীলত অর্জিত হয়। আল্লাহকে মুহাব্বত করার অর্থ হলো তিনি যে সকল স্থান, সময়, ব্যক্তি, কর্ম ও কথা সহ তিনি যেগুলোকে ভালোবাসেন সেগুলোকে ভালোবাসা ও পছন্দ করা।

আল্লাহর ভালবাসা হতে হবে খাঁটি ও একনিষ্ঠভাবে। আর আল্লাহর ভালবাসা স্বভাবজাত ভালবাসার পরিপন্থি নয়। যেমন সন্তানের প্রতি পিতার মুহাব্বত, পিতার প্রতি সন্তানের মুহাব্বত, শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের মুহাব্বত এবং খাদ্য, পানীয়, বিবাহ, পোশাক, বন্ধুবান্ধব ইত্যাদির প্রতি মুহাব্বত। এর কোনটিই আল্লাহকে ভালবাসার পরিপন্থি কিংবা বিপরীত নয়।

নিষিদ্ধ ভালোবাসা আল্লাহর ভালবাসার সঙ্গে শিরকের অনুরূপ। যেমন মুশরিকদের সাথে তাদের মূর্তি ও মনগড়া উপাস্যদের কারণে মুহাব্বত করা এবং নিজের প্রবৃত্তির পছন্দকে আল্লাহর পছন্দের উপর প্রাধান্য দেওয়া, অথবা আল্লাহ যে সব, সময়, স্থান, ব্যক্তি, কথা ও কাজকে অপছন্দ করেন, সেগুলোকে পছন্দ করা। এসবই নিষিদ্ধ ভালবাসা। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালোবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালোবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী।}
[সূরা: আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৬৫]

আল্লাহর মুহাব্বতের ফযীলতসমূহ:

১- নিশ্চয় আল্লাহর মুহাব্বতই হলো প্রকৃত একত্ববাদ। একত্ববাদের রূহ হলো, এক আল্লাহর প্রতি খালেছভাবে মুহাব্বত করা; বরং এটাই ইবাদাতের হাকীকত। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রভুর প্রতি বান্দার মুহাব্বত পরিপূর্ণ না হবে এবং সব কিছুর মুহাব্বতের চেয়ে আল্লাহর প্রতি বান্দার মুহাব্বত অগ্রগণ্য ও প্রাধান্য না পাবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার একত্ববাদে বিশ্বাস পরিপূর্ণ হবে না। আর এই আল্লাহপ্রীতিই তার মাঝে শাসন ও কতৃত্ব করবে। অর্থাৎ বান্দার অন্যসব পছন্দ অপছন্দ হবে আল্লাহর পছন্দ অপছন্দের ভিত্তিতে। আর এতেই সে সফল ও সার্থক হতে পারবে।

২. বিপদের সময় আল্লাহ প্রেমিক, প্রশান্তি লাভ করবে। অনন্তর আল্লাহর প্রেমিক মুহাব্বতের এমন অনাবিল স্বাদ পাবে যা তাকে মুসিবতের কথা ভুলিয়ে দেবে। আর কঠিনতর বিপদাপদ ও তার উপর অতি সহজ বলে মনে হবে।

আল্লাহকে ভালবাসা, তাঁকে ভয় করা এবং তাঁর কাছে রহমতের আশা করার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ইবাদাত নেই। আল্লাহ ও তাঁর সাথে সাক্ষাতের আকাঙ্খা কোমল বাতাসের মত যা অন্তরের উপর প্রবাহিত হলে দুনিয়ার মোহ কেটে যায়।

৩- নেয়ামতের পরিপূর্ণতা ও সীমাহীন আনন্দ লাভ: এটা আল্লাহর প্রতি মুহাব্বত ছাড়া অর্জন হয় না। আর তাঁর প্রতি মুহাব্বত ও তাঁর দিকে অগ্রসর হওয়া ছাড়া অন্তর স্বকীয়তা লাভ করে না। অন্তর পরিতৃপ্ত হয় না এবং পূর্ণতা পায় না। যদি সে আনন্দের সকল উপকরণ পেয়ে যায় তবুও আল্লাহর মুহাব্বত ছাড়া প্রশান্তি পাবে না। সুতরাং আল্লাহর মুহাব্বত নফসের জন্য নেয়ামত স্বরূপ। সুস্থ অন্তর, পবিত্র মানসিকতা, পরিশুদ্ধ চিন্তাশক্তির কাছে আল্লাহর প্রতি মুহাব্বত, তাঁর ঘনিষ্ট হওয়া, এবং তাঁর সাক্ষাতের আগ্রহের চেয়ে বেশী সুমিষ্ট, সুস্বাধু, আনন্দদায়ক নেয়ামত আর কিছু নেই। আল্লাহর মুহাব্বতের মাঝে মুমিন যে সৌন্দর্য খুঁজে পাবে তা সকল সৌন্দর্যের উর্ধ্বে। আর এর মাধ্যমে যে নেয়ামত অর্জিত হয় তা সর্বদিক দিয়ে অধিক পরিপূর্ণ। এবং এরচেয়ে উপভোগ্য কোন জিনিস পৃথিবীতে নেই। «তিনটি জিনিস যার মধ্যে পাওয়া যাবে সে প্রকৃত ঈমানের স্বাদ পেয়েছে। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল অন্য সবকিছু থেকে তার কাছে প্রিয় হবে। সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কোন ব্যক্তিকে ভালবাসে। আল্লাহ তাকে কুফরী থেকে মুক্তি দেয়ার পর পুনর্বার কুফরীতে ফিরে যাওয়া আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই অপছন্দ করে।»
(-বোখারী, মুসলিম, নাসায়ী।)

প্রতাপশালী মহামহিম আল্লাহ তা'আলার প্রেম ও আনুগত্যে নিজেকে বিলীন করে দিয়ে যে আত্মিক প্রশান্তি লাভ না করেছে তারচেয়ে হতভাগা পৃথিবীতে আর কেউ নেই।

আল্লাহর প্রতি মুহাব্বত সৃষ্টিকারী কিছু বিষয়:

যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালবাসে এবং তাঁকে আপন করে নেয় আল্লাহ তা'আলাও তাকে ভালোবাসেন। আল্লাহর মুহাব্বতের প্রথম আলামত হলো, বান্দা তাঁকে যেমন ভালবাসবে তেমন ভালবাসা আর কোন মাখলুকের প্রতি হবে না। আল্লাহর প্রতি মুহাব্বত সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো।

১- অর্থ ও মর্ম বুঝে উপদেশ গ্রহণের নিয়তে কুরআন পাঠ করা। সুতরাং যে ব্যক্তি কুরআনের প্রতি মনোযোগী হবে এবং সেই মহাগ্রন্থ অনুযায়ী আমল করবে তার অন্তর আল্লাহর মুহাব্বতে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।

২- ফরয নামাযের পর নফল নামায আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা। «বান্দা নফল নামাযের মাধ্যমে আমার সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী হয়। এতেকরে আমি তাকে ভালবাসতে শুরু করি। যখন আমি তাকে ভালবাসি তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শ্রবণ করে। এবং তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে অবলোকন করে। তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে। তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে হাঁটে। যদি সে কিছু চায় তবে আমি অবশ্যই তা দান করব। যদি সে আমার কাছে আশ্রয় চায় তবে অবশ্যই তাকে আশ্রয় দান করব।»
(-বোখারী (হাদীসে কুদসী)।)

৩- মুখে, অন্তরে, কথায়, কর্মে সর্বাবস্থায় আল্লাহর জিকির ও স্মরণ করা।

৪- মনের চাহিদার উপর আল্লাহর পছন্দকে প্রাধান্য দেয়া।

{যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালবাসবে।}[সূরা: আল-মায়েদা, আয়াত: ৫৪]

৫- আল্লাহর নামসমূহ ও তাঁর গুণাবলী এবং সেগুলোর সংশ্লিষ্ট জ্ঞান অন্তরে ধারণ ও লালন করা।

৬- আল্লাহর প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য দান, অনুগ্রহ ও কল্যাণকর নেয়ামতসমূহের কথা চিন্তা ও কল্পনা করা।

৭- অন্তরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সামনে সমর্পণ ও বিনয়াবনত করা।

৮- রাতের শেষ অংশে যখন আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন তখন একান্তচিত্তে নির্জনস্থানে তাঁর প্রতি মনোনিবেশ করা। বান্দা একাকী আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হবে, তাঁর সাথে মুনাজাতের মাধ্যমে কথা বলবে। কুরআন তেলাওয়াত করবে। আদবের সাথে তাঁর সামনে নামাযে দাঁড়াবে এবং তাওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে এসব ইবাদাতের সমাপ্তি ঘটাবে।

৯- ফলের স্তুপ হতে যেমন উৎকৃষ্ট ফল বেছে নেয়া হয়, তেমন আল্লাহ প্রেমিক সত্যবাদীদের সান্নিধ্যে বসে তাদের কথা থেকে উৎকৃষ্ট উপদেশ আহরণ করা। আর সচরাচর অপ্রয়োজনীয় ও অকল্যানকর কথা না বলা। কল্যানকর এবং অন্যের জন্য উপকারী কথাই বলা উচিত।

১০- এমন বিষয় থেকে দূরে থাকা যা অন্তর ও আল্লাহর মাঝে ব্যবধান করে দেয়।

আল্লাহর মুহাব্বতের দ্বারা বান্দার লাভ:

যে আল্লাহকে ভালবাসে তিনি তাকে সুপথ প্রদর্শন করেন এবং তাকে নৈকট্য দান করেন।

«আল্লাহতা'আলা ইরশাদ করেন: আমি আমার বান্দার ধারনার নিকটবর্তী। সে যখন আমাকে স্মরণ করে আমি তার সাথেই থাকি। সে যদি আমাকে মনে মনে স্মরণ করে তবে আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। যদি সে আমার বিষয়ে কোন দলের সম্মুখে আলোচনা করে তবে আমি তাদের চেয়ে উত্তম দলের সম্মুখে তার আলোচনা করি। যদি সে এক বিঘত আমার প্রতি অগ্রসর হয় তবে আমি তার প্রতি একহাত অগ্রসর হই, যদি সে এক হাত অগ্রসর হয় তবে আমি দুই বাহু পরিমাণ অগ্রসর হই। যদি সে আমার কাছে হেঁটে আসে তবে আমি তার প্রতি দৌড়ে অগ্রসর হই।»
(-সহীহ বুখারী (হাদীসে কুদসী)।)

বান্দা যখন আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে তখন সে হেদায়েতের ভিন্ন স্তরে আরোহন করে। আর যখন সে আল্লাহকে ভালোবাসে তখন তার হেদায়াত বেড়ে যায়। ফলশ্রুতিতে তার তাকওয়া বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, কেননা হেদায়েত মানুষের তাকওয়া বাড়িয়ে দেয়।

যাকে আল্লাহ ভালবাসেন তাকে ভূমণ্ডলে গ্রহণযোগ্য ও প্রিয় করে দেন।

অর্থাৎ আল্লাহ যে বান্দাকে ভালবাসেন, তাকে তিনি সর্বজনগ্রাহ্য করে দেন, তার প্রতি সকলে আকৃষ্ট হয়, সন্তষ্ট হয় ও গুনকীর্তন করে এবং কাফের ছাড়া সবকিছুই তাকে ভালবাসে। কাফের যেহেতু আল্লাহর ভালবাসাকেই প্রত্যাখ্যান করেছে, সে কি করে আল্লাহর প্রিয় বান্দাকে ভালবাসবে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালবাসেন তখন জিবরীলকে ডেকে বলেন- আমি অমুক বান্দাকে ভালবাসি তুমিও তাকে ভালবাস। এরপর জিবরীল আসমানে ঘোষণা করেন, অমুক বান্দাকে আল্লাহ ভালবাসেন তোমরাও তাকে ভালবাস। তখন আসমানবাসী তাকে ভালবাসতে শুরু করেন। এরপর জমিনে তার গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হয়।»
-(মুসলিম।)

এমনিভাবে আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালবাসেন, তাকে স্বীয় প্রতিপালন ও পরিচর্যা দ্বারা পরিবেষ্টন করে রাখেন। সবকিছু তার অনুগত করে দেন। সকল কঠিন তার জন্য সহজ করে দেন। সকল দূরবর্তী জিনিস তার নিকটবর্তী করে দেন। দুনিয়ার সকল কাজ তার জন্য সহজ করে দেন। ফলে সে কোন ক্লান্তি ও কষ্ট অনুভব করে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:{যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, তাদেরকে দয়াময় আল্লাহ ভালবাসা দেবেন}[সূরা: মারইয়াম, আয়াত: ৯৬]

আল্লাহ যাকে ভালবাসেন তাকে আপন সান্যিধ্যে স্থান দেন। যখন আল্লাহ বান্দাকে ভালবাসেন তখন তাকে নিজের কাছে রেখে প্রতিপালন করেন এবং আপন পরিচর্যার দ্বারা তাকে পরিবেষ্টন করে রাখেন। তাকে কষ্ট দেয়ার বা ক্ষতি করার সাধ্য কারো থাকে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- «মহান আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি আমার অলীকে (বন্ধুকে) কষ্ট দেয় আমি তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা দেই। আমার বান্দা আমার আরোপিত ফরয কাজের মাধ্যমে, এবং নফল কাজের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে। এভাবে (এক স্তরে) আমি তাকে ভালবাসতে থাকি। আর যখন আমি তাকে ভালবাসি তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে এবং তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলাফেরা করে। আর যদি সে আমার নিকট কিছু চায়, আমি তাকে দেই। আর যদি আমার নিকট আশ্রয় চায় তাহলে আমি তাকে আশ্রয় দেই। আমি যা করি সে বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি না। কিন্তু মুমিন যদি মৃত্যুকে অপছন্দ করে তবে আমি তার প্রাণ নিয়ে সংশয়ে ভুগি। কেননা তার কোন ভুল হোক আমার পছন্দ নয়।» (-বোখারী।)

সত্যিকারের ঈমান রূহের খোরাক এবং প্রশান্তির ময়দান। যেমন আল্লাহকে অস্বীকার করা রূহের মৃত্যুসম এবং অস্থির জীবনের উপকরণ।

আল্লাহ যাকে ভালবাসেন তার দোয়া কবুল করেন। মুমিন বান্দাদের দোয়া কবুল করা তাদের প্রতি আল্লাহর ভালবাসার প্রমাণ। এমন বান্দা দোয়ার জন্য আকাশের দিকে হাত তুলতেই তাকে নেয়ামত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেন। তারা যখন বলে, হে আমার রব! আল্লাহ তা'আলা বলেন-{আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুত: আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে।}[সূরা: আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৮৬]

সালমান ফারসী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- «আল্লাহ চিরঞ্জীব ও মহান। বান্দা যখন তাঁর কাছে দোয়ার জন্য হাত তোলে তখন তাকে হতাশ করে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।» (-তিরমিযী।)

যখন আল্লাহ তা'আলা কোন বান্দাকে ভালবাসেন তখন ফেরেশতাদেরকে তার মাগফিরাত কামনায় নিযুক্ত করেন। ফেরশতাগণ ঐ ব্যক্তির মাগফিরাত কামনা করেন আল্লাহ যাকে ভালবাসেন। তারা তার জন্য আল্লাহর রহমত কামনা করেন। মহান আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-{যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার চারপাশে আছে, তারা তাদের পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মুমিনদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতএব, যারা তওবা করে এবং আপনার পথে চলে, তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।}[সূরা: গাফির, আয়াত: ৭]

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- {আকাশ উপর থেকে ফেটে পড়ার উপক্রম হয়, আর তখন ফেরেশতাগণ তাদের পালনকর্তার প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করে এবং পৃথিবীবাসীদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে। শুনে রাখ, আল্লাহই ক্ষমাশীল, পরম করুনাময়।}[সূরা: আশ-শুরা, আয়াত: ৫]

আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালবাসেন তখন তাকে নেক আমলের উপর মৃত্যু দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- «আল্লাহ তা'আলা যখন কোন বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে মধু পান করান। মধু পান করানো দ্বারা উদ্দেশ্য কি জিজ্ঞেস করলে হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- আল্লাহ তাকে মৃত্যুর পূর্বে নেক আমলে অভ্যস্ত হওয়ার তাওফীক দেন এবং এর উপরই তার মৃত্যু দেন।» (-আহমদ।)

আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালবাসেন তাকে মৃত্যুর সময় অভয় ও নিরাপত্তা দান করেন।

আল্লাহ যখন তাঁর কোন বান্দাকে ভালোবাসেন তাকে দুনিয়াতে নিরাপদ জীবন দান করেন। মৃত্যুর সময় তাকে ফেরেশতা দ্বারা অভয় ও নিরাপত্তার সুসংবাদ দেন এবং ঈমানের উপর অটল রাখেন। অতঃপর তার প্রতি ফেরেশতা প্রেরণ করেন, যারা কোমলভাবে তার জান কবজ করে নেন। মৃত্যুর সময় তাকে ঈমানের উপর দৃঢ়পদ রেখে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:{নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোন।}[সূরা: ফুসসিলাত, আয়াত: ৩০]

আল্লাহ যাকে ভালবাসেন তাকে চিরস্থায়ী জান্নাত দেন।

আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন আখেরাতে সে জান্নাতে থাকবে। অতঃপর আল্লাহ তাকে সেখানে এমন সম্মান দিবেন যা সে কখনো চিন্তা করেনি এবং অন্য কারো ভাবনায়ও যা আসেনি। আল্লাহ তাঁর প্রিয়দের এমন জান্নাত দান করবেন যেখানে তারা যা কামনা করবে তাই পাবে। যেমনটি হাদীসে কুদসীতে বর্ণনা করা হয়েছে-

«আল্লাহ তা'আলা বলেন- আমি নেককার বান্দাদের জন্য এমন জান্নাত তৈরি করেছি যা কোন চোখ দেখেনি, কোন কান শ্রবণ করেনি এবং কোন মনে এর কল্পনাও সৃষ্টি হয়নি। যদি চাও তো এই আয়াত পড়ে দেখো-» {কেউ জানে না তার জন্যে কি কি নয়ন-প্রীতিকর লুক্কায়িত আছে।}[-বোখারী।]

আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ও আনুগত্য ছাড়া দুনিয়া উপভোগ্য হবে না। তাঁর দর্শন লাভ ব্যতিরেকে জান্নাতও আনন্দময় হবে না।

বান্দার প্রতি আল্লাহর ভালবাসার অন্যতম ফল ও উপকারিতা হলো, বান্দার আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ করা।

আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের সম্মুখে স্বীয় নূরসহ প্রকাশিত হবেন। ফলে তাদের কাছে আর আল্লাহর দীদারের চেয়ে প্রিয় কিছুই থাকবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণিমার রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন-«তোমরা অচিরেই তোমাদের রবকে দেখতে পাবে যেমন এই চাঁদকে দেখছো। তাঁকে দেখতে তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না। সুতরাং যদি তোমাদের সামর্থ থাকে, তবে তোমাদের উপর ফজরের সালাত ও আছরের সালাতে যেন (শয়তান) বিজয়ী না হয় (অর্থাৎ এই দুই নামায যেন কাজা না হয়। বরং তা আদায় করবে)। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করলেন-» {এবং আপনার রবের স্বপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করুন সূর্য্য উদয় ও অস্তাচলের পূর্বে।}(-বোখারী।)

আল্লাহর মুহাব্বত সংক্রান্ত কিছু জ্ঞাতব্য:

১- আল্লাহ কোন বান্দাকে ভালবাসার অর্থ এই নয় যে, তার কোন বিপদ আসবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-«নিশ্চয় বড় বিপদের সাথে রয়েছে উত্তম প্রতিদান। আল্লাহ যখন কোন জাতিকে পছন্দ করেন তখন তাদেরকে বিপদের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। যে বিপদের এই পরীক্ষায় সন্তুষ্ট হবে তার জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর যে এই পরীক্ষার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে তার জন্য রয়েছে অসন্তুষ্টি।» (-তিরমিযী।)

আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেন এবং তার গুনাহসমূহকে নিঃশেষ করে দেন। তার অন্তরকে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত করে দেন। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-

{আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যে পর্যন্ত না ফুটিয়ে তুলি তোমাদের জেহাদকারীদেরকে এবং সবরকারীদেরকে, এবং যতক্ষণ না আমি তোমাদের অবস্থান সমূহ যাচাই করি।}
[সূরা: মুহাম্মাদ, আয়াত: ৩১]

আল্লাহ তা'আলা বলেন:{এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো। তারা সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়েত প্রাপ্ত।}
[সূরা: বাক্বারাহ, আয়াত: ১৫৫- ১৫৭।]

২- নাফরমানী ও অবাধ্যতা, বান্দার প্রতি আল্লাহর ভালবাসাকে কমিয়ে দেয়, এবং সেটাকে অপূর্ণ করে দেয়। ঈমানের মত মুহাব্বতেরও একটি মূল আছে এবং তার রয়েছে পরিপূর্ণতা। গুনাহের কারণে তার পরিপূর্ণতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর সংশয় ও কপটতা মুহাব্বতের মৌলভিত্তিকেও নিঃশেষ করে দেয়। যার অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালবাসা নেই সে কাফের, মুরতাদ ও মুনাফিক। তার মধ্যে ঈমানের লেশমাত্র নাই। পক্ষান্তরে পাপাচারী ব্যক্তির ব্যাপারে একথা বলা যাবে না যে, তার মাঝে আল্লাহর মুহাব্বত নেই। বরং বলা যেতে পারে যে আল্লাহর প্রতি তার মুহাব্বত ত্রুটিপূর্ণ। আর এই মুহাব্বতের উপর ভিত্তি করে প্রত্যেকে যার যার প্রতিদান পাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-«যদি তোমরা গুনাহ না করতে তবে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই এমন একটি জাতি সৃষ্টি করতেন যারা গুনাহ করতো অতঃপর (তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত) আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিতেন।» (-আহমদ।)

শিরক, সন্দেহ ও প্ররোচনা থেকে অন্তর ও মনের মুক্তিই হচ্ছে প্রকৃত স্বাধীনতা। আর মনের দাসত্বই প্রকৃত দাসত্ব ও ইবাদাত, যেখানে গাইরুল্লাহর দাসত্বের কোন স্থান থাকবে না।

৩- আল্লাহর প্রতি মুহাব্বত, স্বভাবজাত মুহাব্বতের বিরোধী নয়। যেমন পানাহার, নারী ইত্যাদির প্রতি টান প্রকৃতিগত বিষয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

«দুনিয়াতে দুটি জিনিস আমার নিকট প্রিয়: ১. নারী, ২. সুগন্ধি।» (আহমাদ।)

সুতরাং পৃথিবীতে এমন কিছু জিনিস রয়েছে যেগুলোর মুহাব্বত করা শিরক নয়। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এসব বস্তুকে মুহাব্বত করেছেন। এজন্য এমন সব বস্তুকে মুহাব্বত করা জায়েজ যার মুহাব্বত নিষিদ্ধ বা হারাম নয়।

৪- যে ব্যক্তি কাউকে এমনভাবে ভালবাসবে যেমন আল্লাহকে ভালবাসে সে মুশরিক। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী। আর কতইনা উত্তম হত যদি এ জালেমরা পার্থিব কোন কোন আযাব প্রত্যক্ষ করেই উপলব্ধি করে নিত যে, যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর আযাবই সবচেয়ে কঠিনতর।}
[সূরা: আল-বাক্বারাহ, আয়াত:১৬৫]

এ আয়াতে তাদের ব্যাপারে সতর্কবাণী আরোপ করা হয়েছে যারা ইবাদাত ও সম্মানের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভালবাসার মত আর কাউকে ভালবাসবে।

«রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হচ্ছে আল্লাহর জন্য কাউকে ভালবাসা এবং আল্লাহর জন্য কারো সাথে শত্রুতা করা।» (আহমদ)

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-{বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর-আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তাঁর রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত।}
[সূরা: আত-তাওবাহ, আয়াত: ২৪]

এ আয়াতে তাদের প্রতি কঠিন সতর্কবাণী রয়েছে যারা উক্ত আট শ্রেণীর প্রতি আল্লাহ থেকে বেশী মুহাব্বত পোষণ করেন। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- «তোমরা কেউ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সন্তান, পিতা ও অন্যদের চেয়ে আমাকে অধিক ভাল না বাসবে।» (-ইবনে মাজাহ।)

৫- ঈমানদারদের ভালবাসার পরিবর্তে মুশরিকদের বন্ধুরূপে গ্রহণ ও তাদেরকে ভালবাসা মূলত: আল্লাহর প্রতি ভালবাসার সংগে সাংঘর্ষিক বিষয়। সুতরাং আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ঈমানের মস্তবড় মূলনীতি। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-

{মুমিনগণ যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোন কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশঙ্কা কর, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে।}
[সূরা: আলে-ইমরান, আয়াত: ২৮।]

আল্লাহ তা'আলা মুমিন বান্দাদেরকে কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন এবং এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর বন্ধুত্ব থাকবে না। সুতরাং আল্লাহর বন্ধুদের ভালবাসা ও শত্রুদের ভালবাসা ভিন্ন ও বিপরীত দুটি বিষয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশঙ্কা কর, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে।}
[সূরা: আলে-ইমরান, আয়াত: ২৮।]

কাফেরদের সাথে কেবল ঐ সকল লোকদেরকে বন্ধুত্বের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যারা কাফেরদের অনিষ্টের শিকার হওয়ার আশংকাবোধ করে। শুধু এ ক্ষেত্রেই তাদের সাথে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করা যাবে। তখন তাদের সাথে বাহ্যিকভাবে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করা যাবে তবে অন্তর ঈমানের প্রতি অবিচল থাকবে এবং কাফেরদের কুফরের প্রতি ঘৃণা থাকবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:{যার উপর জবরদস্তি করা হয় এবং তার অন্তর বিশ্বাসে অটল থাকে সে ব্যতীত।}
[সূরা: আন-নাহল, আয়াত: ১০৬]

ভালবাসার চমক

যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পার্থিব জীবন ও আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের মধ্যে একটিকে গ্রহণ করার স্বাধীনতা দেয়া হয় তখন তিনি বলেন: «বরং পরম বন্ধুর সান্নিধ্য।» (-আহমদ।)

সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর মুহাব্বত ও তাঁর সাথে সাক্ষাতকে প্রাধান্য দেন এবং আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হওয়াকে দুনিয়ার মোহ ও ভোগের উপর প্রাধান্য দেন।

আল্লাহর প্রতি ভালবাসার নিদর্শন হলো অধিক পরিমাণে তাঁকে স্মরণ করা এবং তাঁর সাক্ষাতের প্রতি উদগ্রীব হওয়া। কেউ কোন বস্তুকে ভালবাসলে তার স্মরণ এবং সাক্ষাতের চেয়ে প্রিয় তার কাছে আর কি থাকতে পারে?

-রবী' ইবনে আনাস।


২- আশা:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, (হতাশ করে) দূরে সরিয়ে দিও না। (-বুখারী)

ব্যাখ্যা:

আশা বলা হয়-

আল্লাহর অস্তিত্ব, অনুগ্রহ ও দয়াকে উপলব্ধি করা ও তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের কথা মনে করে আনন্দিত হওয়া এবং এ বিষয়ে তাঁর উপর পূর্ণ ভরসা ও আস্থা রাখা। আশা মানুষের কলবকে আল্লাহ এবং জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন:{যে গোনাহ করে কিংবা নিজের অনিষ্ট করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, করুণাময় পায়।}[সূরা: আন-নিসা, আয়াত:১১০]

প্রকারভেদ:

আশা তিন প্রকার। দুটি ইতিবাচক এবং একটি নেতিবাচক ও গর্হিত।

১- আল্লাহর প্রত্যাদেশ অনুযায়ী তাঁর আনুগত্য করে সাওয়াবের প্রত্যাশা করা।

২- কেউ গুনাহ করে তাওবা করল এবং আল্লাহ তাকে মাফ করে দিবেন, তার গুনাহ মিটিয়ে দিবেন, ক্ষমা করে দিবেন ও তার গুনাহকে ঢেকে রাখবেন মর্মে আশা করা।

৩- কোন ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন, পাপ ও গুনাহ অব্যাহতবাবে করতে থাকল এবং আল্লাহর রহমত ও মাফের আশা করল। এটা একটি ধোঁকা এবং মিথ্যা আশা। এমন আশার কোনই মূল্য নেই। মুমিনের আশা, আমলের দ্বারা পূর্ণ হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-{আর এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে, যারা ঈমান এনেছে এবং যারা হিজরত করেছে আর আল্লাহর পথে লড়াই (জেহাদ) করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী। আর আল্লাহ হচ্ছেন ক্ষমাকারী করুনাময়।}
[সূরা: আল-বাক্বারাহ, আয়াত:২১৮।]

আশার স্তরসমূহ

আশার অনেক স্তর রয়েছে। যার একটি অপরটি থেকে উন্নত। এই স্তরসমূহ হলো-

১- এমন আশা যা ইবাদাতে মগ্ন হতে উৎসাহিত করে। ইবাদাতকে তার কাছে উপভোগ্য করে তোলে। যদিও সে ইবাদাত কঠিন ও কষ্টসাধ্য হয়। এ আশা তাকে গুনাহ ও গর্হিত কাজ থেকেও বিরত রাখবে।

২- আল্লাহকে পাওয়ার সাধনায় রত ব্যক্তিদের আশা। যা তারা কূ-প্রবৃত্তির চাহিদাসমূহ পরিত্যাগ এবং তাদের সৃষ্টিকর্তার পছন্দনীয় বিষয়সমূহের জন্য বাধাগ্রস্ত হয় এমন কাজকে পরিত্যাগ করার মাধ্যমে করে থাকে। যাতে তাদের কলব আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হয়ে যায়।

৩- বিশিষ্ট বান্দাগণের আশা: পুনরুত্থানকারী মহান স্রষ্টার সাথে মিলিত হওয়ার আশা করা, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত লাভের জন্য ব্যাকুল থাকা এবং অন্তরজুড়ে একমাত্র আল্লাহর দীদার লাভের প্রবল ইচ্ছা থাকা। আশার প্রকারসমূহের মধ্যে এটা হচ্ছে সর্বোত্তম ও সর্বোচ্চ মর্যাদার। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-{অতএব, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার এবাদতে কাউকে শরীক না করে।}[সূরা: আল-কাহাফ, আয়াত:১১০।]

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- {যে আল্লাহর সাক্ষাত কামনা করে, আল্লাহর সেই নির্ধারিত কাল অবশ্যই আসবে। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।}
[সূরা: আল-আনকাবুত, আয়াত:৫]

যে ব্যক্তি কোনকিছুর আশা করে সে তা পেতে চেষ্টা করে।

আল্লাহ ও তাঁর নাম ও গুণাবলীর সঙ্গে আশার সম্পর্ক:

যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে উপরোল্লেখিত কোন প্রকারের আশা পোষন করে, সে নিরবিচ্ছিন্নভাবে আল্লাহর আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ও ঈমানের দাবীর উপর অটল থাকে। সে আল্লাহর কাছে আশা করে যে, আল্লাহ তাকে বক্র করবেন না। তার আমলসমূহ ফিরিয়ে না দিয়ে কবুল করে নিবেন। তার সাওয়াব ও প্রতিদান বৃদ্ধি করে দিবেন। সে আল্লাহর অনুগ্রহের আশায় সাধ্যমতো সব চেষ্টাই করে। আল্লাহর পরিচয়, তাঁর নামসমূহ এবং গুণাবলী সম্পর্কে অবহিত হওয়ার কারণে সে জানে যে আল্লাহ তার সাথে দয়ার্দ্র, ক্ষমাশীল, দানশীল ও মায়াবী আচরণ করবেন। তিনি পুরো দুনিয়ার জন্যই দয়ালু। তিনি সকলকে নিরাপত্তা দান করবেন।

আশার ফলাফল:

১- যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি আশা রাখে সে আনুগত্য ও আমল বৃদ্ধি করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।

২- এমন ব্যক্তির আনুগত্য নিরবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। অবস্থার পরিবর্তন বা প্রতিকূলতা তার পথচলাকে ব্যহত করতে পারে না।

৩- এমন ব্যক্তি সর্বদা আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রতি মনোযোগী থাকে। তার মাঝে থাকে আল্লাহর কাছে মুনাজাতের প্রচণ্ড বাসনা। সে নম্রতা ও মিনতি নিয়ে তাঁর কাছে প্রার্থনা করে।

৪- তার মধ্যে পরিপূর্ণ দাসত্ব প্রকাশ পায়। অভাব ও প্রয়োজন পূরণের ভার সে পুরোপুরি রবের উপর সোপর্দ করে। সে এক মহূর্তও নিজেকে আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার অমুখাপেক্ষী মনে করে না।

৫- আল্লাহর অস্তিত্ব ও অনুগ্রহের উপর তার পরিপূর্ণ আস্থা সৃষ্টি হয় এবং এ বিশ্বাস সৃষ্টি হয়- যে তাঁর কাছে প্রার্থনা করে, অথবা তাঁর রাহে দান করে, তার জন্য তিনি অধিক দানশীল। তিনি চান বান্দা তাঁর নিকট প্রার্থনা করবে, আশা করবে এবং বারবার আশা করতেই থাকবে।

৬- আশা বান্দাকে আল্লাহর মুহাব্বতের চৌকাঠে নিয়ে ফেলে। তাকে মুহাব্বতের পরাকাষ্ঠায় নিয়ে যায়। অতঃপর যখনই তার আশা তীব্র হয়, সে যা আশা করে তা লাভ করে। তখন রবের প্রতি তার ভালবাসা, কৃতজ্ঞতা এবং সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পায়। আর এটাই বন্দেগী ও দাসত্বের মূল দাবী বা ভিত্তি।

আশা পোষণকারী ব্যক্তি সর্বদা আগ্রহী, ভীত এবং তার রবের অনুগ্রহের প্রত্যাশী হয়। আল্লাহর প্রতি তার উত্তম ধারণা সৃষ্টি হয়। মুমিনব্যক্তি তার রবের প্রতি সুধারণা পোষণ করে। তার আমল হয় অত্যন্ত সুন্দর। আর পাপাচারী ব্যক্তি তার রবের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে বিধায় তার আমলও হয় খারাপ। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করে সে বিশ্বাস করে, তাঁর কাছে আশ্রয় গ্রহণকারী ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'আলা ধ্বংস করবেন না।

৭- আশা মানুষকে কৃতজ্ঞতার সোপানে নিয়ে যায়। কেননা আশা তাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশে উদ্বুদ্ধ করে। আর এটাই হলো গোলামী ও দাসত্বের সারমর্ম।

৮- আশা বান্দাকে আল্লাহর নাম এবং গুণাবলীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় যে, তিনি মহান দয়ালু, সম্মানিত, দোয়া কবুলকারী, সুন্দর, অমুখাপেক্ষী। তিনি মহান পবিত্রতার অধিকারী।

৯- আল্লাহর প্রতি আশা মানুষের কামনা-বাসনা পূর্ণ হওয়ার উপায়। আর কাঙ্খিত বাসনা পূর্ণ হওয়ার ফলে বান্দা আরো বেশি দু'আর প্রতি প্রলুব্ধ ও আল্লাহর দিকে মনোযোগী হয়। এমনিভাবে বান্দার ঈমান বৃদ্ধি হতে থাকে এবং সে দয়াময়ের নিকটবর্তী হতে থাকে।

১০- কিয়ামতের দিন মুমিনগন আল্লাহর সন্তুষ্টি, জান্নাত ও প্রতিপালকের দর্শন ইত্যাদি নেয়ামত লাভের মাধ্যমে যখন নিজের আজীবনের লালিত আশার প্রতিফলন দেখতে পাবে, তখন সে উল্লাসিত হবে। আর এসব অর্জন হবে আল্লাহর প্রতি বান্দার আশা ও ভয়ের অনুপাতে।

আশা সংক্রান্ত কতিপয় জ্ঞাতব্য:

১- মুমিনের জন্য আশা পোষণ করার পাশাপাশি ভয়ও পোষন করা জরুরী এবং আল্লাহর প্রতি ভয়ের ক্ষেত্রেও পাশাপাশি আশা পোষন অত্যাবশ্যকীয়। সুতরাং যে ক্ষেত্রে আশা পোষণ করা উচিত সেখানে ভয়ও থাকতে হবে: আল্লাহ তা'আলা বলেন:{তোমাদের কি হল যে, তোমরা আল্লাহ তা’আলার শ্রেষ্টত্ব আশা করছ না।}
[সূরা: নূহ, আয়াত: ১৩]

মহান আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: {মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদেরকে ক্ষমা করে, যারা আল্লাহর সে দিনগুলো সম্পর্কে বিশ্বাস রাখে না} [সূরা: আল-জাছিয়া, আয়াত: ১৪]

অর্থাৎ তাদের পূর্ববর্তীদের উপর যেমন ধ্বংসাত্মক আজাব অবতীর্ণ হয়েছিল তেমন আজাব তাদের উপর আপতিত হওয়াকে তারা ভয় করে না।

২- আশা হচ্ছে এমন ঔষধ, প্রতি মুহূর্তেই আমরা তার মুখাপেক্ষী:

নফসের উপর যখন নিরাশা ভর করে তখন ইবাদাত থেকে মন উঠে যায়।

ব্যক্তির উপর ভয় যখন অতিমাত্রায় প্রভাব বিস্তার করে, তখন তার ও তার পরিবারের জন্য অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়। অতঃপর তার এই ভয় একপর্যায়ে শরীয়তের কাঙ্খিত সীমা লঙ্ঘন করে। সে ক্ষেত্রে যে বিষয়টি তাকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসবে, সেটি অবলম্বন করা উচিত। আর তা হচ্ছে আশা। আশা হলো মুমিনের স্বভাবজাত বিষয়।

৩- আশা হলো নিরাশার বিপরীত। নিরাশা আল্লাহর রহমত সম্পর্কে হতাশা সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর কাছে অনুগ্রহের আশা করা থেকে মনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এটা গোমরাহী ও কুফরীর কারণ। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কাফের সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য কেউ নিরাশ হয় না।}[সূরা: ইউসুফ, আয়াত: ৮৭।]

যদি কোন পাল্লা দিয়ে খাঁটি মুমিনের ভয় এবং আশা পরিমাপ করা হয় তবে তা সমান সমান পাওয়া যাবে। কতই না ভালো হতো আমার হিসাব যদি আমার পিতার কাছে দেয়া হতো! আর আমার স্রষ্টা আমার পিতা হতে উত্তম।

-ইমাম সুফিয়ান সাওরী।

ভয় এবং আশা ব্যতীত ইবাদাত পরিপূর্ণ হবে না। ভয় অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে আর আশা দ্বারা আনুগত্য বৃদ্ধি পায়।

-ইমাম ইবনে কাসির।


৩- ভয়:

{আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে তোমাদের সাবধান করছেন।} [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত :৩০]।

ব্যাখ্যা:

আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করা কলবী ইবাদাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {এরা যে রয়েছে, এরাই হল শয়তান, এরা নিজেদের বন্ধুদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো না। আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।}
[সূরা: আলে-ইমরান, আয়াত: ১৭৫]

উক্ত আয়াতের আলোকে বুঝা যায়, এক আল্লাহর প্রতি ভয় পোষণ করা মুমিনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। আয়াতটি থেকে জোরালোভাবে এও প্রমাণিত হয় যে, ভয় ঈমানের বৈশিষ্ট্যসমূহের মাঝে অন্যতম। সুতরাং বান্দার ঈমানের গভীরতার অনুপাতে তার মধ্যে আল্লাহর ভয় থাকবে।

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: «আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম-{এবং যারা যা দান করবার তা কম্পিত হৃদয়ে দান করে’-} এরা কি ঐ সকল লোক যারা মদ পান করে এবং চুরি করে? তিনি বললেন: না হে সিদ্দীক কন্যা! এরা হচ্ছে ঐ সকল লোক যারা রোযা রাখে, নামায আদায় করে, সাদকা করে এবং তাদের এ কর্ম কবুল করা হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে।» (-তিরমিযী।)

আল্লাহভীতি সৃষ্টির উপায় সমূহ:

১- আল্লাহ তা'আলার প্রতাপ, মহত্ব এবং তাঁর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞানার্জন। {তারা তাদের উপর পরাক্রমশালী, তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে।}[সূরা: আন-নাহল, আয়াত: ৫০।]

২- যেস্থানে আমরা কেউই যেতে চাই না, সেই জাহান্নাম ও কঠোর শাস্তি এবং নিকৃষ্ট গন্তব্যে গমনের ভয় অন্তরে পোষন করা।

৩- আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত কর্তব্যপালনে নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতির অনূভুতি অন্তরে লালন করা। সেই সাথে একথাও কল্পনায় রাখা যে, আল্লাহ তা'আলা সবকিছুই দেখছেন এবং সবাই তাঁর হাতের নাগালে। আর গুনাহের ক্ষুদ্রতা ও তুচ্ছতার কথা আমলে না এনে বরং সব সময় যার নাফরমানী করা হচ্ছে, সেই আল্লাহর মহত্বের কথা মাথায় রাখা উচিত।

৪- আল্লাহর কালাম-কুরআনে কারীমের সেইসব আয়াত সমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করা, যাতে রয়েছে আল্লাহর অবাধ্য ও শরীয়ত অমান্যকারী, এবং আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত নূরকে পরিত্যগকারীর জন্য সতর্কবাণী ও হুশিয়ারী।

৫- আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হাদীসের প্রতি গভীরভাবে চিন্তা করা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত অধ্যয়ন করা।

৬- আল্লাহর বড়ত্বের কথা চিন্তা করা। কেননা যে আল্লাহর বড়ত্ব নিয়ে চিন্তা করবে, তার দৃষ্টিজুড়ে আল্লাহর গুনাবলী ও মহত্বের বিষয়গুলো বিরাজ করবে। আর যার অন্তর আল্লাহর মর্যাদা ও আযমত প্রত্যক্ষ করবে, সে আল্লাহকে অবশ্যই ভয় করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:{আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে তোমাদের সাবধান করছেন।}
[সূরা: আলে-ইমরান, আয়াত: ২৮।]

মহান আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- {তারা আল্লাহকে যথার্থরূপে বোঝেনি। কেয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোতে এবং আসমান সমূহ ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে।} [সূরা: যুমার, আয়াত: ৬৭।]

আল্লাহর প্রতি ভয় আল্লাহ সম্পর্কে আরো জানতে বাধ্য করে, আর আল্লাহ সম্পর্কে জানলে তাঁর প্রতি অন্তর বিনয়ে অবনত হয়, যা মানুষকে আল্লাহর অনুগত করে।

৭- মৃত্যু ও তার ভয়াবহতা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা এবং এ বিষয়েও চিন্তা করা যে মৃত্যু থেকে পলায়নের কোন পথ নেই: আল্লাহ তা'আলা বলেন:{বলুন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়নপর, সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখামুখি হবে।}
[সূরা: আল-জুমুয়া, আয়াত: ৮]

এটা আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- «দুনিয়ার স্বাদ বিনষ্টকারী মৃত্যুকে তোমরা অধিক পরিমাণে স্মরণ কর। কেউ যদি মৃত্যুকে অসচ্ছল অবস্থায় স্মরণ করে তবে সে প্রশান্তি লাভ করবে, আর যে সচ্ছল অবস্থায় মৃত্যুকে স্মরণ করবে দুনিয়ার প্রতি তার আকর্ষণ কমে যাবে।» (তবরানী)

৮- মৃত্যু পরবর্তী জীবন, কবর এবং কবরের ভয়াবহতা নিয়ে চিন্তা করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- «আমি তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করতাম, কিন্তু এখন তোমরা কবর জিয়ারত করো, কারণ এটা দুনিয়ার মোহ কমিয়ে দেয় এবং আখিরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।» (ইবনে মাজাহ।)

হযরত বারা রা. বলেন: «'আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে একটি জানাজায় শরীক ছিলাম, এক পর্যায়ে তিনি কবরের পাশে বসে পড়লেন এবং এতো বেশি ক্রন্দন করলেন যে মাটি ভিজে গেল, এরপর বললেন- হে আমার ভাইয়েরা! এভাবে তোমরাও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো।»
(-ইবনে মাজাহ।)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-{হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, এবং ভয় কর এমন এক দিবসকে, যখন পিতা পুত্রের কোন কাজে আসবে না এবং পুত্রও তার পিতার কোন উপকার করতে পারবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর ওয়াদা সত্য। অতএব, পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে ধোঁকা না দেয় এবং আল্লাহ সম্পর্কে প্রতারক শয়তানও যেন তোমাদেরকে প্রতারিত না করে।} [সূরা: লুকমান, আয়াত: ৩৩]

৯। ছোট ছোট গুনাহের ধ্বংসাত্মক পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করা; এসব গুনাহ মানুষকে তুচ্ছ ও লাঞ্চিত করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উদাহরণ পেশ করলেন একদল মুসাফিরের সঙ্গে, যারা 'বাতনে ওয়াদী' নামক জায়গায় অবতরণ করেছিলো, এরপর তারা সবাই মিলে রান্নার জন্য জালানী কাঠ সংগ্রহ করলো, এখানে কাঠ ও আগুন প্রজ্জলের মাঝে একটা প্রচেষ্টা ও সম্পর্ক রয়েছে। ঠিক একই ভাবে গুনাহগারের জাহান্নামে জ্বলার মাঝে তার কৃত গুনাহ সমূহের ভূমিকা ও সম্পর্ক রয়েছে: {তাদের চামড়াগুলো যখন জ্বলে-পুড়ে যাবে।}[সূরা: আল-নিসা, আয়াত: ৫৬]

১০। বান্দার জানা উচিত যে, হঠাৎমৃত্যু তার ও তওবার মাঝে অন্তরায় হয়ে দাড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে অনুশোচনা ও আক্ষেপ কোন কাজে আসবে না। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- {যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে: হে আমার পালণকর্তা! আমাকে পুনরায় (দুনিয়াতে) প্রেরণ করুন।}[সূরা: আল-মুমিনুন, আয়াত: ৯৯।]

তিনি ইরশাদ করেন- {আপনি তাদেরকে পরিতাপের দিবস সম্পর্কে হুশিয়ার করে দিন।}[সূরা: মারইয়াম, আয়াত: ৩৯।]

১১- অশুভ পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করা। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-{ফেরেশতারা কাফেরদের জান কবজ করে; প্রহার করে, তাদের মুখে এবং তাদের পশ্চাদদেশে।}
[সূরা: আল-আনফাল, আয়াত: ৫০।]

১২- এমন লোকদের সান্নিধ্যে বসা যাদের মধ্যে আল্লাহর ভয় বিরাজমান। আল্লাহ তা'আলা বলেন:{আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহবান করে।}
[সূরা: আল-কাহাফ, আয়াত: ২৮।]

আল্লাহর ভয়ের দুটি দিক আছে:

(ক) আল্লাহর আজাবকে ভয়:

যে শাস্তির হুশিয়ারী প্রদান করা হয়েছে মুশরিক ও অবাধ্যদের জন্য এবং তাদের জন্য যারা তাকওয়ার পথ এবং আল্লাহর আনুগত্যকে এড়িয়ে চলে।

(খ) আল্লাহকে ভয় করা:

এই ভয়টি সাধারণত: উলামা ও আল্লাহর পরিচয়লাভকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মাঝে থাকে: {আল্লাহ তা'আলা তাঁর সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন।}[সূরা: আলে-ইমরান, আয়াত: ২৮।]

আল্লাহর মারেফাত ও পরিচয় যত বেশি থাকে, তার ভয়ও তত বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {আমার বান্দাদের মধ্যে উলামারাই আল্লাহকে অধিক ভয় করে।}[সূরা: ফাতির, আয়াত: ২৮।]

কেননা উলামায়ে কেরাম যখন আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর মারেফাত তাঁর পূর্ণ পরিচয় লাভ করেন, তখন তাদের মাঝে আল্লাহভীতি বৃদ্ধি পায়। এরপর অন্তরে এর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে, অতঃপর পুরো শরীরে।

কারো অন্তরে যখন আল্লাহভীতি সৃষ্টি হয়, তখন তা প্রবৃত্তির মন্দ তাড়না ও চাহিদাগুলোকে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দেয় এবং এর ফলে তার মন থেকে দুনিয়ার মোহ কমে যায়।

আল্লাহভীতির উপকারিতা ও ফলাফল:

(ক) আল্লাহভীতির পার্থিব ফলাফল:

১- আল্লাহর ভয় দুনিয়াতে মানুষকে কতৃত্ব এনে দেয় এবং ঈমান ও আন্তরিক প্রশান্তি বৃদ্ধি করে; কেননা, আপনি যখন প্রতিশ্রুত বস্তু লাভ করবেন, তখন প্রতিশ্রুতিদাতার প্রতি আপনার ভরসা আরো বেড়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- {কাফেররা পয়গম্বরগণকে বলেছিল: আমরা তোমাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেব, অথবা তোমরা আমাদের ধর্মে ফিরে আসবে। তখন তাদের কাছে তাদের পালনকর্তা ওহী প্রেরণ করলেন যে, আমি জালিমদেরকে অবশ্যই ধ্বংস করে দেব। তাদের পর তোমাদেরকে দেশে আবাদ করব। এটা ঐ ব্যক্তি পায়, যে আমার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকে ভয় করে।}[সূরা: ইবরাহীম, আয়াত: ১৩- ১৪]

২- আল্লাহভীতি মানুষকে নেক আমল ও ইখলাসের প্রতি উৎসাহিত করে। সাথে সাথে দুনিয়াতে এর বিনিময় যেন কামনা না করে; বরং একনিষ্ঠতা অবলম্বন করে, সে মর্মেও উৎসাহিত করে। আখিরাতে এমন ব্যক্তির সাওয়াবে কোন হ্রাস হবে না। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- {তারা বলে: কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি এবং তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না। আমরা আমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে এক ভীতিপ্রদ ভয়ংকর দিনের ভয় রাখি।}
[সূরা: আল-ইনসান, আয়াত: ৯- ১০।]

কারো অন্তরে যখন আল্লাহভীতি সৃষ্টি হয়, তখন তা প্রবৃত্তির মন্দ তাড়না ও চাহিদাগুলোকে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দেয় এবং এর ফলে তার মন থেকে দুনিয়ার মোহ কমে যায়।

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: {আল্লাহ যেসব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করার এবং সেগুলোতে তাঁর নাম উচ্চারণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে; এমন লোকেরা, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামায কায়েম করা থেকে এবং যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে।}[সূরা: আন-নূর, আয়াত: ৩৬]

অর্থাৎ আল্লাহর ভয়ে তারা ব্যাকুল থাকে। আর এই চেতনাই তাদেরকে আমলের দিকে অগ্রসর করে। তারা নাজাত ও মুক্তির কামনা করতে থাকে এবং ধ্বংসের পথ পরিহার করে। তারা বাম হাতে আমলনামা প্রাপ্তিকে ভয় করে।

যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে তবে সেই ভয় তাকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করে।

(খ)আল্লাহভীতির পরকালীন ফলাফল:

১- আল্লাহর ভয়ে ভীত বান্দা কিয়ামতের দিন আরশের ছায়ায় স্থান পাবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- «এবং এমন ব্যক্তি (আরশের নিচে ছায়া পাবে) যাকে অভিজাত সুন্দরী কোন রমণী প্রস্তাব দেয়া সত্ত্বেও সে বলে; আমি আল্লাহকে ভয় করি।» (-বোখারী।)

বাহ্যত: উক্ত হাদীসে সুন্দরী রমনীর কুপ্রস্তাবের জবাবে, নেককার যুবক আল্লাহর ভয়ের কথাটি প্রকাশ করেছে, মহিলাকে নিবৃত করা ও নিজকে উপদেশ দানের জন্য। অর্থাৎ যেন সে ঘোষিত আল্লাহভীতির দাবি অনুসারে চলতে পারে। «এমন ব্যক্তি যে নিভৃতে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চোখের পানি ছেড়ে দেয়।» (-বোখারী,)

চোখে অশ্রুর প্রবাহ সৃষ্টিকারী ভয় মানুষকে এমন স্তরে নিয়ে যায় যে, কিয়ামতের দিন আগুন এই চোখ স্পর্শ করবে না।

২- ভয় মাগফিরাতের কারণ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস এই সাক্ষ্যই দেয়-«পূর্বের যুগের এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তা'আলা অনেক ধন-সম্পদ দান করেছিলেন, মৃত্যুর সময় তিনি ছেলেদের ডেকে বললেন- আমি বাবা হিসাবে কেমন ছিলাম? তারা বলল- উত্তম, অতঃপর তিনি বললেন, আমি কোন নেক কাজ করি নাই, সুতরাং আমি যখন মারা যাবো তোমরা আমাকে জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দিবে, এরপর তা পিষে গুড়ো করবে, তারপর তা ঝড়োবাতাসে উড়িয়ে দিবে। ছেলেরা নির্দেশ মত সব করল। অতঃপর আল্লাহ তার সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একত্রিত করে বললেন- তুমি এমনটি কেন করেছিলে? সে বলল, আপনার ভয়। অতঃপর আল্লাহ তাকে রহমত ও দয়া দ্বারা বেষ্টন করে নিলেন।» (-বোখারী।)

যে ব্যক্তি আল্লাহর পুনর্জীবন দানের ক্ষমতাকে অবিশ্বাস করে সে কাফের। কিন্তু উক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে তার অজ্ঞতাকে ওজর হিসাবে কবুল করেছেন আল্লাহ তা'আলা। তার ভয় রবের কাছে সুপারিশকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

৩- আল্লাহর ভয় মানুষকে জান্নাতে পৌঁছে দেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

«যে ভয় পায় সে আত্মরক্ষার্থে রাতে সফর করে, আর যে রাতে সফর করে সে সচেতনার কারণে গন্তব্যে পৌছতে পারে। তোমরা জেনে রেখো- নিশ্চয় আল্লাহর পুরস্কার অত্যন্ত দামী। আর তা হলো জান্নাত। (সুতরাং আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগরুক রাখো এবং সাবধানে দুনিয়ার জীবন পাড়ি দাও। তবেই গন্তব্যে পৌঁছুতে পারবে।)» (-তিরমিযী।)

৪- যার মাঝে আল্লাহর ভয় আছে, সে কিয়ামতের দিন নিরাপদে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা হাদীসে কুদসীতে ইরশাদ করেন: «আমার ইজ্জতের কসম! আমার বান্দার জন্য দুটি ভয় ও দুটি নিরাপত্তাকে একত্রিত করি না। যদি সে দুনিয়ায় আমাকে ভয় করে তবে কিয়ামতে আমি তাকে নিরাপত্তা দান করব। আর দুনিয়ায় আমাকে যে নিরাপদ মনে করবে (ভয় না করবে) কিয়ামতের দিন তাকে আমি সন্ত্রস্ত রাখবো» (-বায়হাকী।)

৫- আল্লাহ তা'আলা তাঁর ঈমানদার বান্দাদের যেসব গুন-বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন, আল্লাহভীতি অর্জনকারি ব্যক্তি সেসব গুন-বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-{ঈমানদার পুরুষ, ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ, অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ, সত্যবাদী নারী, ধৈর্য্যশীল পুরুষ, ধৈর্য্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ, বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ, দানশীল নারী, রোযা পালনকারী পুরুষ, রোযা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী পুরুষ, যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী নারী।}[সূরা: আল-আহযাব, আয়াত: ৩৫]

উক্ত আয়াতে মুমিনের গুন-বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বর্ণিত প্রত্যেকটি শব্দই মর্যাদাপূর্ণ, যা অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতা করা উচিত।

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- {তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে, ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে। কেউ জানে না তার জন্যে কৃতকর্মের কি কি নয়ন-প্রীতিকর প্রতিদান লুক্কায়িত আছে।}
[সূরা: আস-সিজদা, আয়াত: ১৬]

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-{যে ব্যক্তি দিনে ও রাতে সাজদা ও দণ্ডায়মান হয়ে আল্লাহর ইবাদাত করে এবং আখেরাতকে ভয় করে ও তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না; বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।}
[সূরা: আয-যুমার, আয়াত: ৯]

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- {এবং যারা তাদের পালনকর্তার শাস্তির সম্পর্কে ভীত-কম্পিত। নিশ্চয় তাদের পালনকর্তার শাস্তি থেকে নিঃশঙ্ক থাকা যায় না।}[সূরা: আল-মায়ারিজ, আয়াত: ২৭- ২৮]

আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রতি ভয় পোষণ করার কারণে তাঁর নৈকট্যশীল বান্দাদের প্রশংসা করেছেন। আর আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা হচ্ছেন আম্বিয়ায়ে কেরাম: {তারা সৎকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ত, তারা আশা ও ভীতি সহকারে আমাকে ডাকত এবং তারা ছিল আমার কাছে বিনীত।}
[সূরা: আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৯০]

ফেরেশতাগণও আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-{তারা তাদের উপর পরাক্রমশালী, তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে এবং তারা যা আদেশ পায়, তা করে।}
[সূরা: আন-নাহল, আয়াত: ৫০]

৬- আল্লাহর সন্তুষ্টি:{আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এটা তার জন্যে, যে তারা পালনকর্তাকে ভয় করে।}
[সূরা: আল-বাইয়্যেনাহ, আয়াত: ৮।]

যাঁরা আল্লাহকে প্রকৃতই চিনতে পেরেছেন, সেসব বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ভয়:

আল্লাহর পরিচয় লাভকারী বান্দারা সর্বদা নেক আমলে মগ্ন থাকেন। তারা কখনো নিরাশ হন না। তারাই আল্লাহর ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী ভয় ও বিনয় পোষণ করেন। এর একটি উদাহরণ হলো:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে এত অধিক ক্রন্দন করতেন যে, ক্রন্দনের ফলে তাঁর বুক দিয়ে ফুটন্ত ডেকের শব্দের মত (গম্ভীর) শব্দ শোনা যেত। (আহমদ, আবু-দাউদ ও নাসাঈ।)

আবু বকর রা. জিহ্বা ধরে বলতেন:

«এটাই আমাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে এসেছে।»

এবং তিনি বলতেন:

'«হায়! আমি যদি এমন কোন উদ্ভিদ হতাম যা কেউ ভক্ষণ করে ফেলত!»

উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলতেন:

«আহ! আমি যদি সৃষ্টিই না হতাম!! হায়! আমার মা যদি আমাকে প্রসব না করতেন!!»

এবং তিনি আরো বলতেন:

«ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি ক্ষুধার্ত উটও মারা যায় তবে আমার ভয় হয় যে আল্লাহ আমাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন।»

তিনি আরো বলতেন:

«যদি আকাশ থেকে কোন আহ্বানকারী ডেকে বলতেন হে মানবসকল! তোমাদের মধ্যে একজন ছাড়া সকলেই জান্নাতী। তবে আমি ভয়ে থাকতাম যে সে ব্যক্তি আমি হই কি না!»

হযরত উসমান ইবনে আফফান রা. বলতেন:

«আমার জন্য এটাই ভালো হতো যে আমি মৃত্যু বরণ করবো, কিন্তু পুনরুত্থিত হবো না।»

অথচ তিনি এমন ব্যক্তি যিনি তাসবীহ, সালাত ও তিলাওয়াতে রাত কাটাতেন। তবুও আল্লাহর ভয়ে তাঁর অন্তর এতোটা প্রকম্পিত থাকতো।

উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. আল্লাহর এই বাণী তেলাওয়াত করতেন: {অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন।}
[সূরা: আত-তূর, আয়াত: ২৭।]

তিনি নামাযে অনবরত কাঁদতেন, এবং এই আয়াত পড়তেন: {যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা আপনার দাস, এবং যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তবে আপনিই পরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞ।}[সূরা: আল-মায়েদা, আয়াত: ১১৮।]

আল্লাহর ভয় সংক্রান্ত জ্ঞাতব্য:

১- ভয় প্রসঙ্গে কুরআনে দু'টি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। একটি হলো 'খাশয়াত' অপরটি হলো 'খাউফ'। 'খাশয়াত' الخشية শব্দটি 'খাউফ' الخوف শব্দ থেকে একটু নির্দিষ্ট অর্থের অধিকারী। 'খাশয়াত' الخشية শব্দটি এমন ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য যিনি আল্লাহ সম্পর্কে ধারণা রেখেই তবে তাকে ভয় করেন: {আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাময়।}[সূরা: আল-ফাতির, আয়াত: ২৮।]

অর্থাৎ 'খাশয়াত' হলো যে ভয়ের সাথে ইলমও থাকে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- «জেনে রেখো! আল্লাহর শপথ আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে অধিক সমীহ করি এবং অধিক ভয় করি।» (-মুসলিম।)

আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী, মহত্ব, মর্যাদা ও তাঁর পূর্ণতার ইলমের অনুপাতেই মানুষের মাঝে আল্লাহর ভয় তথা 'খাশয়াত' থাকে।

২- আল্লাহর ভয় তখনই উপকারে আসবে যখন আমল, মুজাহাদা ও যথাযথ তওবার আগ্রহ সৃষ্টি হবে। অপরাধের পরিণাম সম্পর্কে জানা এবং আল্লাহর শাস্তিপ্রদান সংক্রান্ত হুশিয়ারীকে বিশ্বাস করার মাধ্যমে ভয় সৃষ্টি হয়। এছাড়া আল্লাহর মাহাত্ম্য, বড়ত্ব ও মর্যাদা থেকেও ভয় সৃষ্টি হয়। আমল, মুজাহাদা ও তওবায় উৎসাহিত করে না এমন ভয়কে প্রকৃত ভয় বলে না।

৩- আল্লাহর প্রতি ভয় পোষণ করা ঈমানের একটি অত্যাবশ্যকীয় দাবী। ইহা অন্তরের জন্য উপকারী এবং গন্তব্যের শেষ প্রান্তে পৌঁছার মাধ্যম। আল্লাহর ভয় প্রতিটি মানুষের জন্য ফরয। এটা পাপ, দুনিয়ার মোহ, অসৎসঙ্গ, আখিরাত সম্পর্কে ঔদাসীন্য ও নির্বোধ মানসিকতা পোষণ থেকে মানুষকে বিরত রাখে: আল্লাহ তা'আলা বলেন:

{আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাময়।} [সূরা: আল-ফাতির, আয়াত: ২৮] যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে কেউ তার ক্ষতি করতে পারে না। আর যে আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ভয় করে কেউ তার উপকার করতে পারে না।

-ফুজাইল ইবনে আয়াজ।