ব্যক্তির চরিত্র ও আচরণে ঈমান ও তাওহীদের প্রভাব 1

ব্যক্তির চরিত্র ও আচরণে ঈমান ও তাওহীদের প্রভাব 1

প্রথমত: ঈমান ও ইবাদাতের ফলে ব্যক্তির উপর বিশেষ প্রভাব ও প্রতিক্রিয়াসমূহ:

পবিত্রতা:

আল্লাহর একত্ববাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার দ্বারা মুমিনের পবিত্রতা হাসিল হয়। আর এ জন্য আল্লাহ তা'আলা তাকে ভালবাসেন। আল্লাহ পাক বলেন: {নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী, এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে, তাদেরকে পছন্দ করেন।}[সূরা: আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২২২]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- «পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।» (-মুসলিম।)

পতিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। কেননা ইহা ঈমানের শাখা সমূহের অন্যতম। আল্লাহ তা'আলা সকল পবিত্রতাকে ভালোবাসেন। যেমন:

১- আধ্যাত্মিক পবিত্রতা:

অর্থাৎ অন্তরকে গুনাহ ও পাপাচার এবং আল্লাহ পাকের সাথে শিরক করা থেকে পবিত্র রাখা। আর এটা সম্ভব হবে খাঁটি তওবা দ্বারা এবং অন্তরকে শিরক, সন্দেহ, হিংসা, ফাসাদ, রিয়া, অহংকার ইত্যাদি খারাপ গুণ থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে। অন্তরের পবিত্রতা হাসিল হবে, ইখলাস, ভাল কাজের প্রতি আগ্রহ ও ধৈর্য্য এবং সত্যবাদিতা ও বিনয়ের মাধ্যমে।

২- বাহ্যিক পবিত্রতা:

এরদ্বারা উদ্দেশ্য হলো ময়লা ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হওয়া:

নাপাকি দূরীকরণ:

পবিত্র পানি দ্বারা শরীর, কাপড় ও ভূমি ইত্যাদি হতে নাপাকি দূর করা হয়।

অপবিত্রতা দূর করণ:

অপবিত্রতা দূর করা বলতে বুঝানো হয়েছে: নামায, তেলাওয়াত, তাওয়াফ, জিকির ইত্যাদির জন্য ওজু, গোসল বা তায়াম্মুম করা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। -মুসলিম।

সালাত (নামায):

যে সালাতের মাধ্যমে প্রভুর সাথে বান্দার সম্পর্ক সৃষ্টি হয় সে সালাতই তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। বান্দা তার প্রভুর জন্য আনুগত্য, প্রেম, বিনয় ও নত হওয়ার ঘোষণা দেয়। ফলে ইহা তাওহীদ ও রেসালাতের সাক্ষ্যদানের পর ইসলামের সুমহান রুকনের অন্তর্ভুক্ত। ইহা দ্বীনের খুঁটি, বিশ্বাসের নুর। এর ফলে আত্মা প্রশান্তি পায়, অন্তর প্রশমিত হয় এবং হৃদয় শান্তি পায়। ইহা অন্যায় কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী, পাপ মোচনের কারণ। ইহা নির্দিষ্ট সময়ের নির্দিষ্ট কাজ। যা শুরু হয় তাকবীর দিয়ে আর শেষ হয় সালামের মাধ্যমে।

নামায পরিত্যাগকারী হচ্ছে, নামায অস্বীকারকারী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবিশ্বাসকারী, কুরআনকে অস্বীকারকারী। এটা ঈমানের ভিত্তির সাথে অসামাঞ্জস্যপূর্ণ। যে উহার আবশ্যক হওয়া জেনেও অবহেলায় ছেড়ে দিল সে নিজেকে বড় ক্ষতি ও কঠিন হুমকির দিকে ঠেলে দিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- «ব্যক্তি ও কুফর-শিরকের মাঝে পার্থক্য হল নামায ছেড়ে দেয়া।» (-মুসলিম)

কেউ কেউ বলেছেন, এটা কুফর, তবে কুফরে আকবর না। সর্বোপরি এটা ধর্ম থেকে বহিষ্কারকারী কুফর, অথবা সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ ও ধ্বংসকারী বস্তু।

নামাযের অনেক প্রভাব রয়েছে। যেমন:

রাসুল সা. বলেছেন: «নামায হচ্ছে নূর বা আলো»
(- বায়হাকী।)

১- অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে নামায বিরত রাখে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পাঠ করুন এবং নামায কায়েম করুন। নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কর।}
[সূরা: আল-আনকাবূত, আয়াত: ৪৫]

২- দু’শাহাদাতের পর সর্বোত্তম আমল হলো নামায এ ব্যপারে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: «আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, কোন আমল সর্বোত্তম? তিনি বললেন: ওয়াক্ত মত নামায পড়া। তিনি বললেন: আমি আবার বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন: পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করা। তিনি বললেন: আমি আবার বললাম: তারপর কোনটি? তিনি বললেন: আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।» (-মুসলিম।)

বান্দার জন্য স্বীয় প্রভুর নৈকট্য লাভের সর্বোত্তম পন্থা হল নামায।

৩- নামায সকল ভুল ত্রুটি ধুয়ে মুছে দেয়। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহর হাদীস অনুসারে তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের দৃষ্টান্ত হল তোমাদের কারো দরজার পাশ দিয়ে প্রবাহিত নহরের মত, যেখানে সে প্রতিদিন পাঁচ বার গোসল করে।» (-মুসলিম।)

৪- নামায দুনিয়া ও আখিরাতে নামাযীদের জন্য নূর বা আলো স্বরূপ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায সম্পর্কে বলেন:

«যে নামাযের হেফাজত করলো তথা নিয়মিত আদায় করলো, তার জন্য কেয়ামতের দিন তা আলো, দলিল ও মুক্তির কারণ হবে। আর যে হেফাজত করলো না তার জন্য নূর, দলিল কিংবা মুক্তি কিছুই হবে না। এবং সে কেয়ামতের দিন কারুন, ফেরাউন, হামান ও উবাই ইবনে খালফের সাথে থাকবে।» (-আহমদ।)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «নামায হচ্ছে নুর বা আলো।» (-বায়হাকী।)

৫- আল্লাহ নামাযের দ্বারা সম্মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। ভুল-ত্রুটি মোচন করে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোলাম ছাওবান এর বর্ণিত সূত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «তোমার উচিত বেশী বেশী সেজদা করা। প্রত্যেক সেজদার জন্য আল্লাহ তা'আলা একটি মর্যাদা বাড়িয়ে দেন ও একটি গুণাহ মোচন করে দেন।» (-মুসলিম।)

৬- রাবিয়াহ ইবনে আল আসলামির হাদীস মতে রাসূলের সংগে জান্নাতে প্রবেশের সর্বোত্তম পন্থা হল নামায। তিনি বলেন: «আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে একবার রাত্রি যাপন করেছি। আমি তাঁর অজুর পানি ও প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আসলে তিনি বলেন: আমাকে প্রশ্ন কর। আমি বললাম যে, আমি আপনার সাথে জান্নাতে থাকতে চাই। তিনি বললেন: আর কোন কিছু? আমি বললাম: এটাই; তিনি বললেন-তুমি বেশি বেশি সেজদা করো।» (-মুসলিম)

আর নামায হল পরাক্রমশালী আল্লাহ তা'আলা ও দুর্বল বান্দার মাঝে বন্ধন স্বরূপ। মহাশক্তিশালীর শক্তির মাধ্যমে দুর্বলকে শক্তিশালী করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে অধিকহারে আল্লাহ তা'আলার স্মরণ করা হয়। তাঁর সাথে অন্তরের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। এটাই হলো নামাযের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {এবং আমার স্মরণার্থে নামায কায়েম কর।}
[সূরা: ত্বহা,আয়াত: ১৪]

যাকাত

যাকাত হলো আত্মা, সম্পদ ও সমাজকে বিশুদ্ধকারী ও সম্পদ বৃদ্ধিকারী।

যাকাত একত্ববাদে বিশ্বাসী বান্দার আত্মাকে পবিত্র করে, যাকাত বান্দাকে এবং তার সম্পদকে পবিত্র করে। আর যাকাত হলো ধনীদের সম্পদে গরিবদের জন্য ধার্যকৃত অধিকার বা পাওনা। এটা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আত্মাকে বিশুদ্ধ এবং দরিদ্রদের প্রতি ইহসান করার জন্য বিধিবদ্ধ হয়েছে।

যাকাতের গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম। যাকাতকে ইসলামের পঞ্চমূলে অন্তর্ভুক্ত করা যাকাতের গুরুত্ব ও মর্যাদার সুস্পষ্ট প্রমান। যাকাতের উপরোক্ত উপকারিতা সমূহে চিন্তাভাবনা করলে যেকোন বিবেকবানই এই বিধানটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারবে। যাকাতের অন্যতম কিছু উপকারিতা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

১- মানব আত্মাকে কৃপণতা ও লোভ লালসার ত্রুটি থেকে পবিত্র করা।

২- দরিদ্রদের সহযোগিতা করা, মুখাপেক্ষীদের প্রয়োজন মেটানো, এবং বঞ্চিতদেরকে সহযোগিতা করা।

৩- সর্বসাধারণের মঙ্গল প্রতিষ্ঠা করা যার উপর মানুষের জীবন ও কল্যাণ নির্ধারিত হয়।

৪- সম্পদকে পুঞ্জীভূত করার মানসিকতায় লিপ্ত ধনী এবং ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি সীমারেখা; যাতে সম্পদ কোন গোত্রের নিকট অথবা কোন ধনীর নিকট আবদ্ধ না থাকে।

৫- আর নিশ্চয় যাকাত ইসলামী সমাজকে এমনভাবে তৈরী করে যেন তা একই পরিবার। যাকাত সমাজে সবলের সাথে দুর্বলের এবং ধনীর সাথে দরিদ্রের সু-সম্পর্ক স্থাপন করে।

৬- যাকাত মানুষের মনে ধনীদের উপর যে ক্রোধ ও ক্ষোভ আছে তা দূরীভূত করে দেয় এবং আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে নেয়ামত দেয়ার ফলে তাদের প্রতি যে হিংসা বিদ্বেষ থাকে তাও নিঃশেষ করে দেয়।

৭- যাকাত বিভিন্ন অর্থনৈতিক অপরাধ কমিয়ে আনতে সহায়তা করে, যেমন চুরি, লুণ্ঠন, ডাকাতি ইত্যাদি।

৮- মালকে পবিত্র করে এবং মাল বৃদ্ধি করে।

যাকাত ফরয হওয়ার স্পষ্ট দলিল কোরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাতকে ইসলামের স্তম্ভসমূহের মধ্যে অন্যতম ঘোষণা করেছেন। ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তির মধ্যে তিন নাম্বার খুঁটি হলো যাকাত। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: {আর নামায কায়েম কর, যাকাত দান কর, এবং নামাযে অবনত হও তাদের সাথে, যারা অবনত হয়।}
[সূরা: আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ৪৩]

আল্লাহ বলেন: {তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা কর এবং যাকাত দাও। তোমরা নিজের জন্যে পূর্বে যে সৎকর্ম প্রেরণ করবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে। তোমরা যা কিছু কর, নিশ্চয় আল্লাহ তা প্রত্যক্ষ করেন।}
[সূরা: আল বাক্বারাহ, আয়াত: ১১০]

হাদীসে জিবরীলে এসেছে:

«ইসলাম হলো প্রথমত সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নাই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রেরিত রাসূল এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা, রমজানে সিয়াম পালন করা, সামর্থ থাকলে হজ্ব আদায় করা।»
(-মুসলিম)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «ইসলাম পাঁচটি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। এ বিষয়ের উপর সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নাই ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল, সালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা, রমজানের রোযা রাখা এবং সামর্থ থাকলে হজ্ব করা।» (-বুখারী।)

কুরআন ও সুন্নাহের এসব ভাষ্য স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, যাকাত হল ইসলামের স্তম্ভের মধ্যে একটি অন্যতম স্তম্ভ। আর তার গুরুত্ব এতো বেশি, যেন যাকাত ছাড়া ইসলাম পরিপূর্ণ হয় না।

সিয়াম বা রোযা:

আল্লাহ তা'আলা সিয়ামকে শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং এটাকে ইসলামের স্তম্ভের মধ্যে একটি স্তম্ভ বানিয়েছেন। আর সিয়াম হলো: সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ তা'আলা বলেন: {এবং যা কিছু তোমাদের জন্য আল্লাহ দান করেছেন, তা আহরন কর। আর পানাহার কর যতক্ষণ না কাল রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। অতঃপর রোযা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত।}[সূরা: আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৮৭]

বান্দার হৃদয়ে অটল ঈমান এবং আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস, মানুষকে আল্লাহর ফরয সমূহ পালনে সহায়তা করে, যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:{হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার}
[সুরা: আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৮৩]

একত্ববাদে বিশ্বাসী ব্যক্তি সিয়ামের মাধ্যমে আনন্দিত হয় এবং দ্রুত আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেন: «আদম সন্তানের প্রত্যেকটি কাজ তার নিজের জন্য, শুধু রোযা ব্যতীত; কেননা নিশ্চয়ই রোযা আমার জন্য এবং আমি তার প্রতিদান দিব।» (-বুখারী।)

বান্দার জীবনে রোযার অনেক উপকারিতা ও প্রভাব বিদ্যমান- তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

মন ও মননে ঈমানের সৌধ নির্মানে সিয়াম হলো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো।

১- নিশ্চয় সিয়াম বান্দা ও তার সৃষ্টিকর্তার মাঝে এক গোপন রহস্য। এর মাধ্যমে মুমিনের অন্তরে সত্যবাদিতার বীজ স্থাপিত হয়। কেননা সিয়াম অবস্থায় অন্তরে লৌকিকতার কোন জায়গা হয় না। সিয়াম মুমিনের অন্তরে আল্লাহর সর্বদর্শনের বিশ্বাস এবং আল্লাহর ভয় প্রতিপালন করে। আর উক্ত মনোবৃত্তি অর্জন মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি, যা ছাড়া বহু মানুষের জন্যই স্বপ্নের সৌধে পৌঁছা সম্ভবপর হয় না।

২- নিশ্চয় সিয়াম মানুষকে শৃঙ্খলা, ঐক্য, ভালবাসা, ন্যায়পরায়ণতা এবং সমতা বিধানের শিক্ষা দেয়। রোযা মানুষদের অন্তরে দয়া, সহানুভূতি এবং পরোপকারিতার মনোভাব সৃষ্টি করে। যেমনিভাবে ঐক্যবদ্ধ জীবন সমাজকে বিভিন্ন অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে দূরে রাখে।

৩- নিশ্চয় সিয়াম মুসলমানদেরকে তার অন্য ভাইয়ের ব্যাথা বুঝতে সাহায্য করে। রোযা পালনকারী মিসকীন এবং গরিবদের প্রতি সহানুভুতিশীল হয় এবং সে অন্যের কষ্ট দূর করার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকে। আর এভাবে মুসলমানদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব এবং ভালোবাসা প্রতিষ্ঠিত হয়।

৪- নিশ্চয় সিয়াম আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এটি দায়িত্বশীল ও সহনশীল করার একটি কার্যকরী প্রশিক্ষণ।

৫- সিয়াম মানুষকে পাপ কাজে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং মানুষকে প্রভূত কল্যাণ দান করে। এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

«সিয়াম হলো ঢালের মতো, সুতরাং কেউ যেন রোযা অবস্থায় সহবাস না করে, এবং মুর্খের মত কাজ না করে। যদি কোন ব্যক্তি কারো প্রতি তেড়ে আসে অথবা তাকে গালি দেয়, তাহলে সে যেন বলে, আমি রোযাদার আমি রোযাদার। আর কসম ঐ সত্তার যার হাতে আমার প্রাণ; রোযাদারদের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশ্‌কের সুগন্ধের চেয়েও উত্তম। (হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন) কেননা সে আমার জন্য পানাহার এবং তার খাহেশাত পরিত্যাগ করে। রোযা আমার জন্য এবং আমি নিজেই তার প্রতিদান দেব। আর ভাল কাজের প্রতিদান হলো দশ গুণ।» (-বুখারী।)

হজ্ব:

হজ্বের মধ্যে আল্লাহর একত্ববাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। হজ্ব এমন একটি ইবাদাত যা তাওহীদে বিশ্বাসী ব্যক্তির বিশ্বাসকে আরো সুদৃঢ় করে। এর মাধ্যমে ঈমানের পরিপূর্ণতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কেননা হজ্ব আদায়কারী ব্যক্তি হজ্ব আরম্ভ হওয়ার সময় থেকে আল্লাহর একত্ববাদকে ঘোষণা করে, যেমন বলে থাকে- 'লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।' হজ্বের প্রতিটি কাজ সম্পাদনের মাধ্যমে হজ্বকারী ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে পাপ মুক্ত হয়ে যায়, ঠিক যেমন তার মা তাকে নিষ্পাপ অবস্থায় প্রসব করেছিলেন। হজ্ব আদায়কারী ব্যক্তি আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণাকারী। আর হজ্ব হলো- নির্দিষ্ট সময়ে হজ্বের কার্যাবলী সম্পাদন করার জন্য আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করার ইচ্ছা পোষণ করা। আল্লাহর কাছ থেকে যে পদ্ধতি এসেছে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে তা আদায় করেছেন ঠিক সেভাবে হজ্ব আদায় করা। কোরআন ও হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী হজ্ব হল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ফরয ইবাদাত। এ বিষয়ে বিশ্বের সব উলামা একমত।

বান্দার জীবনে হজ্বের প্রভাব:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- নিশ্চয় কা'বার তাওয়াফ করা, সাফা-মারওয়ার মাঝে দৌড়ানো, এবং পাথর নিক্ষেপ করা ইত্যাদি কার্যাবলীকে শুধুমাত্র আল্লাহর স্মরণ সমুন্নত করার জন্যই পালন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আহমাদ।

১- হজ্ব পাপ এবং ভুল-ত্রুটি মার্জনা করার কারণ। এক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষ্য হলো: «তুমি কি জান না যে, নিশ্চয় ইসলাম মানুষের ইসলাম গ্রহণের পূর্বে করা পাপ সমূহকে নি:শেষ করে দেয়, হিজরতও মানুষের হিজরতের পূর্বে করা গুনাহ সমূহকে নি:শেষ করে দেয় এবং হজ্ব ঐ সমস্ত পাপরাশীকে নিশ্চিন্হ করে দেয় যা হজের পূর্বে করা হয়েছিল।» (-মুসলিম।)

২- হজ্ব হল আল্লাহর আদেশ পালন করা। কেননা হজ্ব আদায়কারী ব্যক্তি তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, প্রিয়জনকে ছেড়ে দূরে চলে যায় এবং নিজের সাধারণ পোশাকও পরিহার করে। সর্বোপরি আল্লাহর আদেশ পালনার্থে তাঁর একত্ববাদের ঘোষণা করতে থাকে। যা তার উপর অর্পিত নির্দেশাবলীর অন্যতম।

৩- হজ্ব হলো জান্নাতে প্রবেশ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম কারণ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «মাকবুল হজের প্রতিদান একমাত্র জান্নাত।» (-বুখারী ও মুসলিম।)

৪- হজ্ব মানুষের মাঝে ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে একটি প্রকাশ্য অনুশীলন। যখন মানুষ আরাফাতের ময়দানে একত্রে অবস্থান গ্রহণ করে, তখনই মূলত: এর বাস্তবায়ন হয়ে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষগুলোর মাঝে সেখানে কোন ভেদাভেদ থাকে না। পার্থক্য থাকে শুধু তাকওয়া ও তাওহীদের প্রশ্নে।

৫- হজ্বের মধ্যে বিশ্ব মুসলিমের মাঝে পারস্পরিক পরিচিতি ও সহযোগিতার সূত্রপাত হয়। হজ্বের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির মাঝে মতবিনিময়েরও সুযোগ সৃষ্টি হয়। যা উম্মতের উন্নয়ন ও বিশ্ব নেতৃত্বের উপযোগীতা সৃষ্টি করে।

৬- হজ্ব একত্ববাদ এবং ইখলাসের দিকে আহ্বান করে। যার ফলে হজ্বকারী তার পূর্ণ জীবনটাই ইখলাস এবং তাওহীদের উপর অতিবাহিত করতে পারে। হজ্ব পালন শেষে হজ্ব পালনকারীর মন ও মস্তিষ্কে কেবল আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসই স্থির হয়ে যায়। এরপর সে জীবনভর কেবল আল্লাহর একত্ববাদেই বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর কাছেই দুআ ও প্রার্থনা করে।


দ্বিতীয়ত: সর্বসাধারণের সঙ্গে কৃত আচার ও আচরণে যেসব উপকারিতা ও প্রভাব প্রতিফলিত হয়:

ঈমানদারের অন্তর ও ব্যক্তিগত আচরণে তাওহীদ ও ঈমানের প্রভাব যেমন প্রকাশিত হয়, ঠিক তেমনিভাবে মানুষের সাথে কৃত তার আচরণে এবং চরিত্রেও এর প্রভাব প্রকাশ পায়। এ প্রসঙ্গে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «নিশ্চয় আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দানের জন্য।» (-বায়হাকী।)

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈমান ও চরিত্রের মাঝে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন: «মুমিন ব্যক্তির ঈমানে পরিপূর্ণতা লাভ করে তার উত্তম চরিত্র ও তার পরিবারের প্রতি সদয় আচরণের দ্বারা।» (-তিরমিযী।)

একত্ববাদে বিশ্বাসী বান্দা সর্বদা এই বিশ্বাস লালন করে যে, আল্লাহ সর্বদ্রষ্টা এবং তিনি তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ দ্বারা বেষ্টন করে রাখেন।

ঘরে এবং পরিবারে উত্তম আচরণ:

১- পিতা-মাতার সাথে উত্তম আচরণ:

একত্ববাদে বিশ্বাসী ব্যক্তি তার পিতা-মাতার হকের ব্যাপারে সর্বদা অবিচল থাকে। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা পিতা-মাতার ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বলেছেন: {তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও এবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং বল তাদেরকে শিষ্ঠাচারপূর্ণ কথা। তাদের সামনে ভালবাসার সাথে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বল: হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন। তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মনে যা আছে তা ভালই জানেন। যদি তোমরা সৎ হও, তবে তিনি তওবাকারীদের জন্যে ক্ষমাশীল।}[সূরা: আল-ইসরা, আয়াত: ২৩- ২৫]

এবং আল্লাহ তা'আলা বলেন: {আমি মানুষকে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করার জোর প্রচেষ্টা চালায়, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। আমারই দিকে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদেরকে বলে দেব যা কিছু তোমরা করতে।}[সূরা: আল-আনকাবুত, আয়াত:৮]

২- সন্তানের সাথে সদাচারণ:

সন্তানাদি দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য: আল্লাহ তা'আলা এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন: {ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য।} [সূরা: আল-কাহাফ. আয়াত: ৪৬]

নিশ্চয় মুমিনের অন্তরে থাকা তাওহীদ তাকে তার সন্তানদের উত্তমভাবে লালন পালন করার আহ্বান করে। আর আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে আহ্বান করেছেন, যেন তারা তাদের নিজেদেরকে এবং তাদের পরিবারদিগকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:

{মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ তা’আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।}
[সূরা: আত-তাহরীম, আয়াত: ৬]

প্রত্যেক অভিভাবকই দায়িত্বশীল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «তোমাদের সবাই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। ইমাম একজন দায়িত্বশীল, তিনি তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। আর পুরুষ তার পরিবারের অভিভাবক, সে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন মহিলা তার স্বামীর ঘরে অভিভাবক, সুতরাং তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। আর একজন সেবক তার মনিবের সম্পদের অভিভাবক এবং তার রক্ষণাবেক্ষণে তাকে জিজ্ঞাসা করে হবে।» (-বুখারী।)

৩- স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ:

আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী বান্দা তার স্ত্রীর হক পুরোপুরি আদায় করবে। আল্লাহকে ভয় করবে। স্ত্রীর হক আদায় ও তার প্রতি সদয় আচরণের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশা করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: {আর পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের উপর অধিকার রয়েছে, তেমনি ভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের উপর নিয়ম অনুযায়ী}[সূরা: আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২২৮]

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি যে তার পরিবারের নিকট উত্তম।» (-তিরমিযী।)

একবার যখন কিছু মহিলা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলেন এবং তাদের স্বামীদের ব্যাপারে অভিযোগ করলেন, তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: «তোমাদের মধ্যে উত্তম ঐ ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম।» (-ইবনে মাজাহ।)

৪- স্বামীর সাথে সদাচারণ:

তাওহীদ মুমিন নারীদের অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করে যেন নারীরা তাদের স্বামীদের হকের ব্যাপারে অবিচল থাকে। এর মাধ্যমে তারা তাদের প্রতিপালকের জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। যেমনটি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «যদি কোন নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে, রমযানের রোযা রাখে, লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং তার স্বামীর আনুগত্য করে তাহলে তাকে বলা হবে জান্নাতের যে দরজা দিয়ে তুমি প্রবেশ করতে চাও সেই দরজা দিয়েই প্রবেশ কর।» (- আহমাদ।)

আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর এমন কিছু চাপিয়ে দেন না যা বান্দাদের জন্য কষ্ট হয় বা যা করার সামর্থ তাদের নেই। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন: {বিত্তশালী ব্যক্তি তার বিত্ত অনুযায়ী ব্যয় করবে। যে ব্যক্তি সীমিত পরিমাণে রিযিকপ্রাপ্ত, সে আল্লাহ যা দিয়েছেন, তা থেকে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যা দিয়েছেন, তদপেক্ষা বেশী ব্যয় করার আদেশ কাউকে করেন না। আল্লাহ কষ্টের পর সুখ দেবেন।}[সূরা: আত-তালাক, আয়াত: ৭]

আর কোন সমস্যা ব্যতিরেকে কেউ যেন তালাক না চায়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «যে স্ত্রী সঙ্গত কোন কারণ ছাড়াই স্বামীর কাছে তালাক দাবী করে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।» (-আহমাদ।)

আত্মীয় এবং প্রতিবেশীর সাথে সদাচারন:

আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক এবং প্রতিবেশীর হক:

আল্লাহ তা'আলা তাঁর একত্ববাদ, ইবাদাতের পাশাপাশি বান্দার আখলাক, মানুষের সঙ্গে কৃত আচরণ ও নিকটাত্মীয় এবং প্রতিবেশীর সংগে সদ্ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন ইরশাদ হচ্ছে: {আর উপাসনা কর আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্নীয়, এতীম-মিসকীন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-গর্বিতজনকে।}[সূরা: আন-নিসা, আয়াত: ৩৬]

আল্লাহ তা'আলা বলেন: {আত্নীয়-স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দিন এবং মিসকীন ও মুসাফিরদেরও। এটা তাদের জন্যে উত্তম, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে। তারাই সফলকাম।} [সূরা: আর-রুম, আয়াত: ৩৮।]

নবী কারীম সা. বলেছেন: «যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে সে যেন তার প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করে।» (-মুসলিম।)

কাজেকর্মে ও সকল মানুষের সাথে উত্তম আচরণ:

আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী ব্যক্তির অন্তরে ঈমান এমনভাবে প্রভাব ফেলে যে, তার চরিত্র হয় উত্তম, সে মানুষকে উত্তম উপদেশ দেয় এবং তার সমস্ত কাজ-কর্মে সততা বিদ্যমান থাকে। আর এটাই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম আমল, যার দ্বারা মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে।

১- উত্তম চরিত্র:

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসা করতে গিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: {আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।}[সূরা: আল-ক্বলম, আয়াত: ৪]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «তাকওয়া ও সদ্ব্যবহার মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করাবে।» [-তিরমিযী।]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সেই ব্যক্তি, যে অন্যের উপকার করে। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো- কোন মুসলিমকে সন্তষ্ট করা, অথবা কারো বিপদ দুর করা, অথবা ঋন পরিশোধ করা। অথবা কারো ক্ষুধা নিবারণ করা। কোন ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণার্থে তার সঙ্গ দেয়া আমার কাছে মসজিদে নববীতে একমাস এ’তেকাফ করার চেয়ে অধিক প্রিয়»
(-তাবরানী।)

২- সত্যবাদিতা; আল্লাহ তা'আলা বলেন: {হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।}[সূরা: আত-তাওবাহ, আয়াত: ১১৯।]

এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «নিশ্চয় সত্য পূণ্যের পথ দেখায়। আর পূণ্য জান্নাতের পথ প্রদর্শন করে। মানুষ সত্যের অনুসরণ করতে করতে অবশেষে আল্লাহর নিকট সিদ্দীক (সত্যনিষ্ঠ) নামে অভিহিত হয়। আর মিথ্যা অশ্লীলতার দিকে নিয়ে যায়, এবং অশ্লীলতা জাহান্নামের আগুনের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ মিথ্যার অনুসরণ করতে করতে অবশেষে আল্লাহর নিকট মিথ্যুক নামে অভিহিত হয়।» (-বুখারী।)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «মুনাফিকের আলামত তিনটি; (১) যখন সে কথা বলে তখন মিথ্যা বলে (২) যখন সে কারো সাথে অঙ্গীকার করে তখন সে উক্ত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে (৩) এবং সে আমানতের খেয়ানত করে।» (-বুখারী।)

৩- কাউকে ধোঁকা না দেওয়া এবং মানুষকে উপদেশ দেওয়া: «যদি আল্লাহ তাঁর কোন বান্দাকে জনগণের শাসক নিযুক্ত করেন, আর সে তাদের অধিকার হরণ করে এবং খেয়ানতকারী হিসাবে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন।» (-মুসলিম।)

একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিক্রয়ের জন্য মজুদকৃত খাদ্যশস্যের স্তূপের সামনে দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন তিনি নিজের হাতের আঙ্গুল স্তূপের মধ্যে প্রবেশ করালেন এবং আঙ্গুলে সিক্ততা অনুভব করলেন। অতঃপর স্তূপের মালিককে তিনি বললেন: «এটা কি? (শষ্যের ভেতরে ভেজা কেন?) লোকটি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা বৃষ্টির পানিতে ভিজে গিয়েছিল। তিনি বললেন: ভিজাগুলো স্তূপের উপরে রাখলে না কেন? তাতে লোকেরা দেখতে পেত? এরপর তিনি বললেন: যেব্যক্তি মানুষকে ধোঁকা দেয়, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।» (-মুসলিম।)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে উম্মতকে পবিত্রতা অর্জনের খুঁটিনাটি তথা শৌচাগারাভ্যন্তরের বিষয়াদী শিক্ষা দিয়েছেন, সেখানে তিনি কি মু'মিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- তাওহীদ শিক্ষা দেন নি? আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- যতক্ষণ না লোকেরা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (হাদীসটি সহীহ বোখারীতে বর্ণিত হয়েছে) সুতরাং তাওহীদের হাকীকত হলো, যা দ্বারা মানুষ নিজের জান ও মালকে নিরাপদ করতে পারে।

-ইমাম আনাস ইবনে মালেক।